জিআই স্বীকৃতি মিললেও কাটেনি টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সংকট - Ekotar Kantho

জিআই স্বীকৃতি মিললেও কাটেনি টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সংকট

আরমান কবীর:টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সুনাম ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশে। বাংলাদেশ তথা দেশের বাহিরে টাঙ্গাইলের পরিচিতি রয়েছে তাঁতের শাড়ি, চমচম ও মধুপুরের আনারসের জন্য। কিন্তু কালের আবর্তে সেই ঐতিহ্যের তাঁতের শাড়ির কারিগররা আজ অস্তিত্বের সংকটে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ, অথচ বাড়েনি তাঁতিদের মজুরি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ডিপিডিটি টাঙ্গাইল শাড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প নানা সংকটে ধুঁকছে। অন্যদিকে, বাজারে পাওয়ার লুমে তৈরি কম দামের শাড়ির দাপটে হস্তচালিত তাঁতের শাড়ির চাহিদা আরও কমেছে। এ ছাড়াও বর্তমানে নারীদের শাড়ির চেয়ে থ্রি পিস, সালোয়ার কামিজের প্রতি ঝুঁকে পড়াও এই শিল্পের সংকটের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন তাঁত সংশ্লিষ্ট অনেকে। এই ত্রিমুখী সংকটে সংসারের চাকা সচল রাখতে পূর্বপুরুষের শত বছরের পেশা ছেড়ে রিকশা, অটোরিকশা চালানো, চায়ের দোকান কিংবা দিনমজুরির মতো পেশায় ঝুঁকছেন টাঙ্গাইলের অনেক তাঁতি। অনেকেই পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। জেলা তাঁত বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, বাসাইল ও দেলদুয়ারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার হস্তচালিত তাঁত চালু রয়েছে। বন্ধ রয়েছে প্রায় তিন হাজার তাঁত। অন্যদিকে, পাওয়ার লুমের সংখ্যা জেলায় ২০ থেকে ২৫ হাজার। কম দামে বেশি উৎপাদনের কারণে পাওয়ার লুমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে হস্তচালিত তাঁত শিল্প। সরেজমিনে টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লী খ্যাত দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, সুতা, রং ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শাড়ি উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাড়েনি। সপ্তাহজুড়ে কঠোর পরিশ্রম করে দুই থেকে তিনটি শাড়ি বুনে যে আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাথরাইল এলাকার তাঁতি অভিজিৎ বসাক বলেন, “তাঁত বুনে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সব তাঁত বিক্রি করে দিয়েছি। এখন তাঁতঘরে চায়ের দোকান করেছি। এই কাজ না করলে পরিবার চালানো সম্ভব হতো না।” একই এলাকার তাঁতি অমিত বসাক বলেন, “আগে একটি শাড়ি বুনতে তিন থেকে চার দিন লাগলেও তখন হাতে বোনা শাড়ির মূল্য ছিল। কিন্তু এখন পাওয়ার লুমে দিনে ১৫ থেকে ২০টি শাড়ি তৈরি হচ্ছে। সেই প্রতিযোগিতায় হস্তচালিত তাঁত টিকতে পারছে না।” ফলে অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশাকে বেছে নিয়েছে। পাথরাইলের চন্ডী এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তাতী জানান,“একটি টাঙ্গাইল জামদানি শাড়ি বুনতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। একটি শাড়ির জন্য মজুরি পান ৮৫০ টাকা। সপ্তাহে দুই-তিনটির বেশি শাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয় না। ফলে এই আয় দিয়ে কোনোভাবেই সংসারের ব্যয় মেটানো যায় না।” অনেকেই পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে সুনামের সাথে তাঁতের শাড়ি বুনছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো আছেন তারা। কিন্তু টাঙ্গাইলের তাঁতীদের অধিকাংশই ভালো নেই। পাথরাইল এলাকার শাড়ি ব্যবসায়ী সুবির বসাক বলেন, “হাতে বোনা কাপড়ের এখনও আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় এর দামও বেশি পড়ে। একই ডিজাইনের শাড়ি পাওয়ার লুমে অনেক কম খরচে তৈরি হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই ঝুঁকছেন। এতে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে।” টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, “শাড়ির দাম কমে যাওয়ায় তাঁতিদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে দক্ষ কারিগররা একে একে পেশা ছাড়ছেন। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।” তিনি আরও বলেন, “তাঁতিদের পাশাপাশি লোকসানের মুখে পড়ে অনেক ছোট ও মাঝারি তাঁত মালিকও তাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দক্ষ কারিগরের সংকটে অনেক সচল তাঁতও এখন অচল হয়ে পড়ছে।” বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের টাঙ্গাইল বেসিস সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার জায়দুর রহমান জানান, হস্তচালিত তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও বিপণন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে তাঁতিদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়েছে। পাশাপাশি টাঙ্গাইলে একটি শাড়ি বিপণন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম টাঙ্গাইলের বাজিতপুরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। টাঙ্গাইলে তাঁতের শাড়ি জিআই পন্য স্বীকৃতি । আধুনিক প্রযুক্তি যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তাঁতিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং তরুণ প্রজন্মকে তাঁত শিল্পে আগ্রহী করে তুলবে। তাঁতিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা সহায়তা করা হবে। তাঁত সংশ্লিষ্টদের মতে, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, বাজারে প্রকৃত টাঙ্গাইল শাড়ির সুরক্ষা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প।

আমাদের টাঙ্গাইল ৫ ঘন্টা আগে

ফেসবুকে আমরা

টাঙ্গাইলে শহীদ ফারুক চেয়ারম্যান স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত - Ekotar Kantho

টাঙ্গাইলে শহীদ ফারুক চেয়ারম্যান স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত

সাহান হাসানঃ টাঙ্গাইলে উৎসবমুখর পরিবেশে শহীদ রফিকুল ইসলাম ফারুক চেয়ারম্যান স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) বিকেলে সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের বাসাখানপুর মিনি স্টেডিয়ামে ফারুক চেয়ারম্যান স্মৃতি সংসদ ও বাসাখানপুর স্পোর্টিং ক্লাবের আয়োজনে এই ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ফাইনালে যমুনা এক্সপ্রেস ফুটবল ক্লাব এবং আইয়ান বার্থা ফুটবল ক্লাব মুখোমুখি হয়। খেলায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে আইয়ান বার্থা ফুটবল ক্লাব ৩–০ গোলের ব্যবধানে যমুনা এক্সপ্রেস ফুটবল ক্লাবকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। অনুষ্ঠানে দাইন্যা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. লাভু মিয়া লাভুর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপি'র প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—এই সদর উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামের নাম যেন শহীদ ফারুক স্টেডিয়াম করা হয়। আগামীদিনে জনগণের ভোটে বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে স্টেডিয়ামটির নাম শহীদ ফারুক স্টেডিয়াম করা হবে। এখানে যেকোনো খেলার আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা আমরা করব। বিশেষ করে মা–বোনেরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে খেলা উপভোগ করতে পারেন, এজন্য অতিরিক্ত আরও একটি গ্যালারি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, একসময় টাঙ্গাইলকে ক্রীড়া নগরী বলা হতো। এখানকার ৮ থেকে ৯ জন ফুটবলার নিয়মিত ঢাকার মাঠে খেলতেন। আগামীদিনে আমরা মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত ও কিশোর গ্যাং–মুক্ত একটি নিরাপদ টাঙ্গাইল গড়ে তুলতে চাই। এ লক্ষ্য পূরণে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, জেলা বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু, সদর উপজেলা বিএনপি'র সভাপতি আজগর আলী, জেলা যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার রাশেদুল আলম রাশেদ, সদর থানা বিএনপি'র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আজিম উদ্দিন বিপ্লব, জেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনিরুজ্জামান জুয়েল, জেলা মহিলাদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মমতাজ করিম প্রমুখ। ফাইনাল খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠে কয়েক হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। খেলা শেষে বিজয়ী ও বিজীত দলের মধ্যে ট্রফি ও ব্যক্তিগত পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

কপিরাইট © ২০২২ একতার কণ্ঠ এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।