আরমান কবীর: টাঙ্গাইলের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিতে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে ‘মিষ্টি উৎসব-২০২৬’। বর্ণাঢ্য আয়োজনে ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর তিন দিনের এ উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে টাঙ্গাইল শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠেয় এ উৎসবের ঘোষণা দেওয়া হয় ৩১ আগস্ট টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে, বিশেষ করে জেলা প্রশাসক শরীফা হকের নির্দেশনায় উৎসবটি আয়োজন করা হচ্ছে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ উৎসবের মাধ্যমে টাঙ্গাইলের দুইশত বছবের মিষ্টি তৈরির ঐতিহ্য দেশ ও বিদেশে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জেলার স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন পণ্যকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
উৎসবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মিষ্টি তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের হাতে তৈরি বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য থাকবে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ির বড় পরিসরের প্রদর্শনী।
আয়োজকদের মতে, উৎসবের প্রধান তিনটি লক্ষ্য হলো, টাঙ্গাইলের দুইশত বছরের মিষ্টিশিল্পকে দেশ-বিদেশে তুলে ধরে ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ গড়ে তোলা, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে সংরক্ষণের পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং স্থানীয় পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
টাঙ্গাইলের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য শাড়ি, আনারস, চমচম, সন্দেশসহ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়েছে এবারের উৎসব। এই উৎসবে জেলার ১২ উপজেলা থেকে ২৩টি স্টল অংশ নিয়েছে; এর মধ্যে ২০টি স্টলে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি এবং তিনটি স্টলে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
আয়োজকদের আশা, এর মাধ্যমে জেলার পর্যটন খাত আরও বিকশিত হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মিষ্টি কারিগর, তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা নতুন বাজার ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাবেন।
তিন দিনের এই ‘মিষ্টি উৎসব’ শুধু মিষ্টি খাওয়ার আয়োজন নয়। এটি টাঙ্গাইল মিষ্টির ২০০ বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এক সম্মিলিত উদযাপন।
মেলায় দুই জমজ কন্যাকে সাথে নিয়ে এসেছেন খুরশিদা হক, তিনি জানালেন, তিনি চাকুরী সূত্রে ঢাকায় থাকেন।জেলা প্রশাসনের ফেসবুকে মিষ্টি উৎসবের খবর দেখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। তিনি আরোও জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ি নিয়ে এই ধরনের উৎসবের আয়োজন করা উচিত। মেলার পরিবেশ অত্যন্ত ভালো, পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদে ঘুরছি।
জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বপন ঘোষ বলেন, টাঙ্গাইলের চমচমের ইতিহাস, ২০০ বছরের ইতিহাস। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় ইতিপূর্বে এই নিয়ে কোন ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়নি। বর্তমান জেলা প্রশাসক ও সরকারকে ধন্যবাদ এই মিষ্টি উৎসব আয়োজন করার জন্য। এই মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার লোক এসেছে মিষ্টি খেতে ও পরিবারের জন্য নিয়ে যেতে। আশা করি, এই উৎসবের মাধ্যমে টাঙ্গাইল জেলাকে আরও ব্যান্ডিং করা যাবে।
জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, ‘টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য শুধু টাঙ্গাইলের নয়, এগুলো বাংলাদেশের গর্ব’—এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি টাঙ্গাইলের পর্যটন সম্ভাবনাকেও এগিয়ে নেওয়া হবে।
মেলা উদ্বোধনের পর প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘টাঙ্গাইলের চমচম সারা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের অনেক মানুষই কমবেশি চেনে। টাঙ্গাইলের শাড়ি যেমন বাংলাদেশের গর্ব ও ঐতিহ্য, তেমনি চমচমও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এই পণ্যকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেটিকে মানুষের মাঝে তুলে ধরার জন্যই এ আয়োজন। টাঙ্গাইলে যে ঐতিহ্য ও অর্জন রয়েছে, তা বাংলাদেশের মানুষের জন্যও গর্বের বিষয়। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে আগামী দিনে ঐতিহাসিক ও নিরাপদ টাঙ্গাইল গড়ে তুলতে চাই। এ ব্যাপারে সবার সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’
উল্লেখ্য,- দশরথ গৌড়(বাঙালি হালুইকর) নামে এক ব্যক্তি ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর তীরবর্তী পোড়াবাড়িতে আসেন। তিনি যমুনার পানি ও গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে প্রথমে চমচম তৈরি শুরু করেন। পরে সেখানেই মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেন তিনি।
এর আগে ১৬০৮ সালে পোড়াবাড়ি গ্রামটিকে নদীবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সে সময়কালে ধলেশ্বরীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছিল জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র পোড়াবাড়ি বাজার। তখন পোড়াবাড়ি ঘাটে ভিড়তো বড় বড় সওদাগরি নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার। এ বাজারে যোগ হয় সুস্বাদু চমচম, গড়ে ওঠে মিষ্টির বাজার। ধীরে ধীরে পোড়াবাড়িতে প্রায় অর্ধশত চমচম তৈরির দোকান গড়ে ওঠে। তবে এখন পোড়াবাড়ী নয়, মিষ্টি শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজার।
জেলায় চমচমের পাশাপাশি সাদা চমচম, রসগোল্লা, আমির্তী, পানতোয়া, কালোজাম, ক্ষিরমোহন, রসমালাই, মালাইকারী, ছানার পোলাও, দই (লাল), দই (সাদা), সন্দেশ, জিলাপি, ইত্যাদি এখন মন ভিজিয়েছে ভোজন রশিকদের।
এ ছাড়াও রয়েছে জেলার মির্জাপুর উপজেলার জামুকীর কালিদাসের গুড়ের ও চিনির সন্দেশ জেলাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে।
সাহান হাসানঃ টাঙ্গাইলে উৎসবমুখর পরিবেশে শহীদ রফিকুল ইসলাম ফারুক চেয়ারম্যান স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) বিকেলে সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের বাসাখানপুর মিনি স্টেডিয়ামে ফারুক চেয়ারম্যান স্মৃতি সংসদ ও বাসাখানপুর স্পোর্টিং ক্লাবের আয়োজনে এই ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়।
ফাইনালে যমুনা এক্সপ্রেস ফুটবল ক্লাব এবং আইয়ান বার্থা ফুটবল ক্লাব মুখোমুখি হয়।
খেলায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে আইয়ান বার্থা ফুটবল ক্লাব ৩–০ গোলের ব্যবধানে যমুনা এক্সপ্রেস ফুটবল ক্লাবকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়।
অনুষ্ঠানে দাইন্যা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. লাভু মিয়া লাভুর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপি'র প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—এই সদর উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামের নাম যেন শহীদ ফারুক স্টেডিয়াম করা হয়। আগামীদিনে জনগণের ভোটে বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে স্টেডিয়ামটির নাম শহীদ ফারুক স্টেডিয়াম করা হবে। এখানে যেকোনো খেলার আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা আমরা করব। বিশেষ করে মা–বোনেরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে খেলা উপভোগ করতে পারেন, এজন্য অতিরিক্ত আরও একটি গ্যালারি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, একসময় টাঙ্গাইলকে ক্রীড়া নগরী বলা হতো। এখানকার ৮ থেকে ৯ জন ফুটবলার নিয়মিত ঢাকার মাঠে খেলতেন। আগামীদিনে আমরা মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত ও কিশোর গ্যাং–মুক্ত একটি নিরাপদ টাঙ্গাইল গড়ে তুলতে চাই। এ লক্ষ্য পূরণে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, জেলা বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু, সদর উপজেলা বিএনপি'র সভাপতি আজগর আলী,
জেলা যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার রাশেদুল আলম রাশেদ, সদর থানা বিএনপি'র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আজিম উদ্দিন বিপ্লব, জেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনিরুজ্জামান জুয়েল, জেলা মহিলাদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মমতাজ করিম প্রমুখ।
ফাইনাল খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠে কয়েক হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। খেলা শেষে বিজয়ী ও বিজীত দলের মধ্যে ট্রফি ও ব্যক্তিগত পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।