আরমান কবীর: ১৯৮১ সালে ৬ একর জায়গার উপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর অতিবাহিত হলেও এই টার্মিনালের আর নতুন করে কোন অবকাঠামগত উন্নয়ন হয়নি।
টাঙ্গাইল শহর বেড়েছে, স্ট্যান্ডে গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে, গাড়ির রুট বেড়েছে, কিন্তু বাড়েনি নতুন বাসটার্মিনালের জায়গার পরিমাণ। ফলে নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা জুড়ে গাড়ির জট এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন রুটের লক্কর-ঝক্কর মার্কা বাস। ফলে জনদুর্ভোগ কমছেই না।
বিশেষ করে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রুটে ফিটনেস বিহীন প্রান্তিক গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি এবং সেবার মানও খুবই খারাপ বলে অভিযোগ বাস যাত্রীদের।
সরেজমিনে, বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে গিয়ে দেখা যায়, বাস টার্মিনালের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সারি সারি লক্কর-ঝক্কর মার্কা প্রান্তিক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এদের অধিকাংশই সড়কে চলাচলের জন্য অনুপযোগী বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রান্তিক গাড়ির চালক রুবেল ও আলমাস বলেন, “মালিক যে গাড়ি দেয় আমরা তাই চালাই। ফিটনেস বিহীন লক্কর-ঝক্কর মার্কা গাড়ির জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকেরা। তবে তারা স্বীকার করেন প্রান্তিক পরিবহনে অধিকাংশ গাড়ি ফিটনেস বিহীন।
ঢাকা রুটে চলাচলকারী নিরালা পরিবহনের যাত্রী সৃষ্টি একাডেমিক কলেজের ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্র হাসান ও ধলেশ্বরী পরিবহনের যাত্রী এএসআই শাজাহান বলেন, “গাড়ির সিট গুলো ভালো না। ছারপোকায় ভরা। গাড়ির সিট গুলো আরেকটু আধুনিকায়ন করলে ভালো হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে গাড়িগুলো ছাড়ে এবং পৌঁছায়। সিটিং সার্ভিস হলেও বিভিন্ন স্পটে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলেন। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।”
টাঙ্গাইল জেলা বাস-মিনি বাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুর রহমান খান শফিক বলেন, “আমি দায়িত্ব নেয়ার পর বিভিন্ন রুট থেকে লক্কর-ঝক্কর মার্কা বাস অপসারণ ও যানজট নিরসনে মালিক সমিতির পক্ষে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়াও নিরালা বাস কাউন্টারের জন্য নতুন করে জায়গার ব্যবস্থা করেছেন তারা।
তিনি আরও বলেন, “যাত্রীরা গাড়িতে নিরাপত্তা চায়, পরিবহন যেমনই হোক তারা যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে সেই বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সরকারের পক্ষ থেকে নিরালা পরিবহনের কাউন্টার উচ্ছেদ করার পর আমরা দায়িত্ব নিয়েই নিরালা পরিবহনের জন্য নতুন কাউন্টারে জায়গার ব্যবস্থা করেছি। এছাড়াও নতুন বাস স্ট্যান্ডে যানজট নিরসনে প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছি।”
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, “শহরে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত সিএনজি, অটো রিক্সা ও ব্যাটারি চালিত রিক্সা চলাচল করছে। বিশেষ করে অটো রিক্সা গুলো যেন দুই শিফটে চলাচল করে এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণ সমন্বয় করা হচ্ছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই অটোরিকশা, সিএনজি ও ব্যাটারি চালিত রিক্সা দ্বারা সৃষ্ট শহরে যানজট দ্রুতই নিরসন হবে। শহরের যানজট কমলে, নতুন বাসস্ট্যান্ডের যানজট অটোমেটিক কমে আসবে। তবে একটু সময় লাগবে।”
১৯৮১ সালে ৬ একরে শুরু হওয়া টার্মিনাল আজ ২০২৬ সালেও একই জায়গায়। শহর ও যাত্রী বেড়েছে, কিন্তু অবকাঠামো আটকে আছে সেই পুরনো ফ্রেমেই। ফিটনেসবিহীন বাস, অতিরিক্ত অটো-সিএনজি আর জায়গার সংকট মিলিয়ে টাঙ্গাইলবাসীর দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছেই। যাত্রীদের দাবি, দ্রুত টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
আরমান কবীর: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় সোহেলী তামান্নাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলায় টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. ছানোয়ার হোসেনকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।
এর আগে ভাটারা থানার উপ-পরিদর্শক মো. আমিনুর রহমান ছানোয়ার হোসেনকে আদালতে হাজির করে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতে ছানোয়ার হোসেনের পক্ষে আইনজীবীরা জামিন আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ভাটারা থানার এলাকায় ২০০ থেকে ৩০০ জন আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় গুলিবর্ষণ ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী সোহেলী তামান্না আহত হন। তাঁর বাম হাতের কব্জিতে গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি কোমরের পেছনে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় সোহেলী তামান্না বাদী হয়ে ভাটারা থানায় হত্যা চেষ্টা মামলা করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে আরও বলা হয়, তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীদের হামলায় ছানোয়ার হোসেন উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে মদদ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরমান কবীর:জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, রাজপথে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করলে তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে টাঙ্গাইলের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে জেলা বিএনপির আয়োজনে ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে’ অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “একটা গোষ্ঠী, ফ্যাসিস্ট এই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। জনগণ দ্বারা বিতাড়িত হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গেছে। তারা গুম, খুন, নির্যাতন ও নিপীড়ন করেছে। এই দেশের মানুষকে হত্যা করেছে, নির্বিচারে গুলি করেছে। তারা আজ আবার বিভিন্ন কায়দায় দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়।”
তিনি বলেন, “তাদের এখনো বোধোদয় হয়নি, কী কারণে পালিয়ে গেল। তারা একবারও লজ্জিত হয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাচ্ছে না। এই ষড়যন্ত্র করে বাংলাদেশে কী রাজনীতি করতে পারবেন? পারবেন না। আপনাদের এই দেশের জনগণ বিতাড়িত করেছে। জনগণই আপনাদের প্রতিহত করবে। কারণ বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রপ্রিয়।”
বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশকে ধ্বংস করেছে। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন দেশনায়ক তারেক রহমান।”
তিনি আরও বলেন, “জনগণের দল বিএনপিকে এত সহজে ষড়যন্ত্র করে পার পাবেন—ভাবলে আহাম্মকের স্বর্গে বাস করা ছাড়া কিছুই না। জনগণ ভোটের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। জনগণের দাবি ও অধিকার নিয়ে যখনই কেউ ষড়যন্ত্র করেছে, তারাই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জনগণই তাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছে, ভবিষ্যতেও দেবে।”
রাজপথে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দীর্ঘ ১৭ বছর জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করেছে। কাজেই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই রাজপথে যারা বিশৃঙ্খলা করবে, তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেব, ইনশাআল্লাহ।”
তিনি বলেন, “কোনো অপশক্তি, কোনো ফ্যাসিস্ট যাতে এই দেশের ক্ষতি করতে না পারে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ ব্যাপারে সজাগ থেকে একদিকে আমরা সাংগঠনিক কাজ করব, অন্যদিকে সরকারকে দেশ পরিচালনায় সহযোগিতা করব। আর জনগণের উন্নয়নের জন্য সমান্তরালভাবে কাজ করে যাব, ইনশাআল্লাহ।”
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীন। সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মাহমুদুল হক সানু।
এর আগে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা পৃথক পৃথক মিছিল নিয়ে শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে এসে সমাবেশে অংশ নেন।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী শফিকুল রহমান লিটন, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অমল ব্যানার্জি, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফ পাহেলী ও শফিকুর রহমান খান শফিক, টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক সভাপতি আহমেদুল হক শাতিল, টাঙ্গাইল জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক একেএম মনিরুল হক (ভিপি মনির), টাঙ্গাইল সদর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজিমুদ্দিন বিপ্লব, যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব জাহিদ হোসেন মালা, জেলা মহিলা বিএনপির সভাপতি নিলুফা ইয়াসমিন এবং টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক দূর্জয় হোড় শুভ।
এ ছাড়া জেলা, উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
আরমান কবীর: ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ওরফে ফারুক হত্যা মামলায় টাঙ্গাইলের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ‘খান পরিবারের’ সন্তান সানিয়াত খান (বাপ্পা)সহ তিনজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ মামলায় আরও চার জনকে যাবজ্জীবন এবং একজনকে আদালত বেকুসুর খালাস দিয়েছেন।
টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ফয়সাল আল মামুন সোমবার(২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এই রায় দেন।
মামলায় রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত সরকারি কৌশুলি মোহাম্মদ সাইদুর রহমান (স্বপন) এই রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সানিয়াত খান (বাপ্পা) নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি। তিনি টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খানের ছেলে। এবং একই আসনের সাবেক সদস সদস্য আমানুর রহমান খানের (রানা) ছোট ভাই। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামী হলেন- টাঙ্গাইল শহরের কাগমারা এলাকার আফজাল ফকিরের ছেলে মো. আজাদ ও সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের শ্রীফলিআটা গ্রামের শহীদ মিয়ার ছেলে মো. শাজাহান মিয়া। এদের প্রত্যেককে ১লাখ টাকা করে জরিমানাও করেছেন আদালত। এরা সবাই পলাতক রয়েছেন।
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের কাঠুয়া যোগিনী গ্রামের আব্দুল লতিফ মিয়ার ছেলে মো. সুজন, শ্রীফলিআটা গ্রামের রওশন আলীর ছেলে মো. সানোয়ার হোসেন, বাঘিল ইউনিয়নের ছিটকি বাড়ি গ্রামের নুরু বখ্শের ছেলে রুজবেল ওরফে ইমন এবং শহরের উত্তর কাগমারার নুরুল ইসলামের ছেলে শফিকুল ইসলাম। এদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ মামলার অপর আসামী সঞ্জিত ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
রায় ঘোষণার পর মো. সুজন ও সানোয়ার হোসেনকে আদালত থেকে কারাগারে পাঠানো হয়। অন্য আসামীরা পলাতক রয়েছেন।
অতিরিক্ত সরকারি কৌশুলি মোহাম্মদ সাইদুর রহমান (স্বপন) জানান, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রাত ভ্রমণে বের হন। সকাল ৬টার দিকে শহরের বটতলা বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার পরদিন তার ভাই মো. লাভলু মিয়া বাদি হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ মামলার তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালে ২০১৬ সালে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাজাহান, সুজন ও সানোয়ার হোসেনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তাদের জবানবন্দিতে বের হয়ে আসে সানিয়াত খান (বাপ্পা) ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড করিয়েছেন।
আরমান কবীর:‘আপনারা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করেছেন। বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। জ্বালানির চরম সংকটে মানুষ অতি কষ্টে জীবন যাপন করছে, বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান।
শনিবার(১৯ সেপ্টেম্বর)সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের টাঙ্গাইলের আশেকপুর বাইপাস এলাকায় ১১ দলীয় ঐক্যজোটের লংমার্চের পথসভার বক্তব্যে এ কথা বলেছেন তিনি।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে ।
জামায়াতের আমির জানিয়েছেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যজোট এ লংমার্চ কর্মসূচি শুরু করেছে।
জনতার যৌক্তিক দাবি না মানলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অব্যাহত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন টাঙ্গাইল জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আহসান হাবিব মাসুদ।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, এলডিপি’র চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কাশেম কাশেমী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি এবং টাঙ্গাইল জেলার এনসিপি নেতা রাসেল আহমেদ, তুষার আহমেদ সহ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের শীর্ষ নেতারা।
উল্লেখ্য,শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আয়োজিত ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রংপুরমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান। পরে সড়ক পথে ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে লং মার্চ।
পথসভায় বক্তব্য রাখেন জামাত ইসলামের আমির ডাঃ সফিকুর রহমান
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠেয় এ উৎসবের ঘোষণা দেওয়া হয় ৩১ আগস্ট টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে, বিশেষ করে জেলা প্রশাসক শরীফা হকের নির্দেশনায় উৎসবটি আয়োজন করা হচ্ছে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ উৎসবের মাধ্যমে টাঙ্গাইলের দুইশত বছবের মিষ্টি তৈরির ঐতিহ্য দেশ ও বিদেশে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জেলার স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন পণ্যকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
উৎসবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মিষ্টি তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের হাতে তৈরি বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য থাকবে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ির বড় পরিসরের প্রদর্শনী।
আয়োজকদের মতে, উৎসবের প্রধান তিনটি লক্ষ্য হলো, টাঙ্গাইলের দুইশত বছরের মিষ্টিশিল্পকে দেশ-বিদেশে তুলে ধরে ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ গড়ে তোলা, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে সংরক্ষণের পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং স্থানীয় পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
টাঙ্গাইলের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য শাড়ি, আনারস, চমচম, সন্দেশসহ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়েছে এবারের উৎসব। এই উৎসবে জেলার ১২ উপজেলা থেকে ২৩টি স্টল অংশ নিয়েছে; এর মধ্যে ২০টি স্টলে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি এবং তিনটি স্টলে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
আয়োজকদের আশা, এর মাধ্যমে জেলার পর্যটন খাত আরও বিকশিত হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মিষ্টি কারিগর, তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা নতুন বাজার ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাবেন।
তিন দিনের এই ‘মিষ্টি উৎসব’ শুধু মিষ্টি খাওয়ার আয়োজন নয়। এটি টাঙ্গাইল মিষ্টির ২০০ বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এক সম্মিলিত উদযাপন।
মেলায় দুই জমজ কন্যাকে সাথে নিয়ে এসেছেন খুরশিদা হক, তিনি জানালেন, তিনি চাকুরী সূত্রে ঢাকায় থাকেন।জেলা প্রশাসনের ফেসবুকে মিষ্টি উৎসবের খবর দেখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। তিনি আরোও জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ি নিয়ে এই ধরনের উৎসবের আয়োজন করা উচিত। মেলার পরিবেশ অত্যন্ত ভালো, পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদে ঘুরছি।
জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বপন ঘোষ বলেন, টাঙ্গাইলের চমচমের ইতিহাস, ২০০ বছরের ইতিহাস। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় ইতিপূর্বে এই নিয়ে কোন ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়নি। বর্তমান জেলা প্রশাসক ও সরকারকে ধন্যবাদ এই মিষ্টি উৎসব আয়োজন করার জন্য। এই মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার লোক এসেছে মিষ্টি খেতে ও পরিবারের জন্য নিয়ে যেতে। আশা করি, এই উৎসবের মাধ্যমে টাঙ্গাইল জেলাকে আরও ব্যান্ডিং করা যাবে।
জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, ‘টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য শুধু টাঙ্গাইলের নয়, এগুলো বাংলাদেশের গর্ব’—এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি টাঙ্গাইলের পর্যটন সম্ভাবনাকেও এগিয়ে নেওয়া হবে।
মেলা উদ্বোধনের পর প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘টাঙ্গাইলের চমচম সারা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের অনেক মানুষই কমবেশি চেনে। টাঙ্গাইলের শাড়ি যেমন বাংলাদেশের গর্ব ও ঐতিহ্য, তেমনি চমচমও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এই পণ্যকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেটিকে মানুষের মাঝে তুলে ধরার জন্যই এ আয়োজন। টাঙ্গাইলে যে ঐতিহ্য ও অর্জন রয়েছে, তা বাংলাদেশের মানুষের জন্যও গর্বের বিষয়। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে আগামী দিনে ঐতিহাসিক ও নিরাপদ টাঙ্গাইল গড়ে তুলতে চাই। এ ব্যাপারে সবার সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’
উল্লেখ্য,- দশরথ গৌড়(বাঙালি হালুইকর) নামে এক ব্যক্তি ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর তীরবর্তী পোড়াবাড়িতে আসেন। তিনি যমুনার পানি ও গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে প্রথমে চমচম তৈরি শুরু করেন। পরে সেখানেই মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেন তিনি।
এর আগে ১৬০৮ সালে পোড়াবাড়ি গ্রামটিকে নদীবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সে সময়কালে ধলেশ্বরীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছিল জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র পোড়াবাড়ি বাজার। তখন পোড়াবাড়ি ঘাটে ভিড়তো বড় বড় সওদাগরি নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার। এ বাজারে যোগ হয় সুস্বাদু চমচম, গড়ে ওঠে মিষ্টির বাজার। ধীরে ধীরে পোড়াবাড়িতে প্রায় অর্ধশত চমচম তৈরির দোকান গড়ে ওঠে। তবে এখন পোড়াবাড়ী নয়, মিষ্টি শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজার।
জেলায় চমচমের পাশাপাশি সাদা চমচম, রসগোল্লা, আমির্তী, পানতোয়া, কালোজাম, ক্ষিরমোহন, রসমালাই, মালাইকারী, ছানার পোলাও, দই (লাল), দই (সাদা), সন্দেশ, জিলাপি, ইত্যাদি এখন মন ভিজিয়েছে ভোজন রশিকদের।
এ ছাড়াও রয়েছে জেলার মির্জাপুর উপজেলার জামুকীর কালিদাসের গুড়ের ও চিনির সন্দেশ জেলাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে।
আরমান কবীর:টাঙ্গাইলকে যদি ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্লেষণ করি, তাহলে এর ৩টি পিলার পাব: তাঁত, আনারস, চমচম। তাঁত আজ অস্তিত্ব সংকটে। আনারস মৌসুমি। কিন্তু চমচম? ২০০ বছর ধরে সে একাই টাঙ্গাইলের “সফট পাওয়ার”।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পোড়াবাড়ি গ্রামটি ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত। নদীর পানিতে আয়রন ও মিনারেলের অনুপাত এমন যে ছানা কাটলে দানা হয় ঝরঝরে, কিন্তু শক্ত হয় না। দেশের অন্যান্য জেলার পানিতে সেই “মাউথফিল” আসে না।
টাঙ্গাইলের মিষ্টি তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ হলো তাজা দুধ। দুধ জ্বাল দিয়ে তা থেকে ছানা তৈরি করা হয়। এরপর ছানাকে কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে অতিরিক্ত পানি ঝরে যায়। নিচে রাখা বড় পাত্রে ছানা থেকে ঝরে পড়া তরল জমা হয়।
সাধারণ মেশিনে ১০ মিনিটে যে কাজ হয়, টাঙ্গাইলের চমচমের কারিগর হাতে ২ ঘণ্টা ধরে ছানা মথে। ফলে প্রোটিনের স্ট্রাকচার ভাঙে না। তাই কামড় দিলে দানাদার, কিন্তু গলে যায়।
ছানা প্রস্তুত হওয়ার পর তা ভালোভাবে মথে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়। এরপর চিনির ঘন সিরায় ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয়। দক্ষ কারিগরের হাতের নিপুণতায় সাধারণ ছানা তখন রূপ নেয় সুস্বাদু চমচমে।
ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরিতে যত্ন ও সময় প্রয়োজন হয়। ৬-৭ ঘণ্টা চিনির সিরায় ডোবানোর ফলে চমচমের চিনি ভেতরে ঢোকে। ফলে বাইরে ক্যারামেলাইজড লেয়ার তৈরি হয় আর ভেতরে ৭০% ময়েশ্চার। চমচম তৈরির এই পদ্ধতির কারণে প্রায় ২০০ বছরের খ্যাতি ধরে রেখেছে টাঙ্গাইলের চমচম।
বিদেশে রপ্তানি না হলেও অতুলনীয় স্বাদের কারণে এ জেলা থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় চমচম যায়। এ ছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে না হলেও ব্যক্তি পর্যায়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চমচম রপ্তানি করা হয়।
ইতিহাস বলছে- দশরথ গৌড় নামে এক ব্যক্তি ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর তীরবর্তী পোড়াবাড়িতে আসেন। তিনি যমুনার পানি ও গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে প্রথমে চমচম তৈরি শুরু করেন। পরে সেখানেই মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেন তিনি।
এর আগে ১৬০৮ সালে পোড়াবাড়ি গ্রামটিকে নদীবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সে সময়কালে ধলেশ্বরীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছিল জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র পোড়াবাড়ি বাজার। তখন পোড়াবাড়ি ঘাটে ভিড়তো বড় বড় সওদাগরি নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার। এ বাজারে যোগ হয় সুস্বাদু চমচম, গড়ে ওঠে মিষ্টির বাজার। ধীরে ধীরে পোড়াবাড়িতে প্রায় অর্ধশত চমচম তৈরির দোকান গড়ে ওঠে।
তবে এখন পোড়াবাড়ী নয়, মিষ্টি শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজার।
জেলায় চমচমের পাশাপাশি সাদা চমচম, রসগোল্লা, অমৃতী, পানতোয়া, কালোজাম, ক্ষীরমোহন, রসমালাই, মালাইকারী, ছানার পোলাও, দই (লাল), দই (সাদা), সন্দেশ, জিলাপি, ইত্যাদি এখন মন ভিজিয়েছে ভোজন রসিকদের। এ ছাড়াও রয়েছে জেলার মির্জাপুর উপজেলার জামুকীর কালিদাসের গুড়ের ও চিনির সন্দেশ। যা জেলাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে।
বর্তমানে মিষ্টি শিল্পে টাঙ্গাইলের ঘোষ ও পাল সম্প্রদায় বংশানুক্রমিক ভাবে নিয়োজিত আছে। তবে দে, নাগ ইত্যাদি উপাধিধারী অনেকেও মিষ্টান্ন তৈরিতে নিয়োজিত হয়েছেন। টাঙ্গাইলের মোদক উপাধি প্রাপ্তরাও মিষ্টি শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
টাঙ্গাইল শহর ও পোড়াবাড়ি মিলিয়ে ২০০টির অধিক মিষ্টির দোকান। প্রতিদিন গড়ে প্রতিটি দোকানে ৫ মণ, বছরে প্রায় ১৮০ মণ চমচম তৈরি হয়। প্রতি কেজি গড়ে ৩৫০ টাকা ধরলে শুধু চমচমের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ২৮ কোটি টাকা।
টাঙ্গাইলের মিষ্টির ঐতিহ্যের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানও জড়িত। জেলার বিভিন্ন মিষ্টির দোকান ও কারখানায় বহু মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। প্রতিদিন তাজা দুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ছানা তৈরি, মিষ্টি প্রস্তুত, প্যাকেটজাত ও বাজারজাত, পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ।
পোড়াবাড়ির মিষ্টি ব্যবসায়ীদের মধ্যে বর্তমানে খোকা ঘোষ ও গোপাল চন্দ্র দাস, গৌর ঘোষ, হারু ঘোষ, কানাই ঘোষ উল্লেখযোগ্য।
তবে পোড়াবাড়ি নয়, বর্তমানে টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজার মিষ্টি শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে। জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, গোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও টাঙ্গাইল পোড়াবাড়ি মিষ্টি ঘরে এখনও নির্ভেজাল পোড়াবাড়ির চমচম পাওয়া যায়। এই পাঁচআনি বাজারে প্রায় অর্ধশত মিষ্টির দোকান রয়েছে। আর যেখানে চমচমের জন্ম সেই পোড়াবাড়িতে এখন রয়েছে হাতেগোনা মাত্র চার থেকে পাঁচটি মিষ্টির দোকান।
টাঙ্গাইলের চমচম এখনও কেন এত জনপ্রিয়, সে তথ্য জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা সাহান হাসান ও উম্মে সালমা মাসুদ বলেন, “ছোট বেলায় দেখেছি হাতেগোনা কয়েকটি মিষ্টির দোকান ছিল। এখনতো প্রায় অর্ধশতাধিক দোকান হয়েছে। সে সময়ের মিষ্টির স্বাদ ও বর্তমানে যে স্বাদ তাতে অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু মিষ্টির গুণগত মান আগের তুলনায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। অন্যান্য মিষ্টির তুলনায় পোড়াবাড়ির চমচম অনেক সুস্বাদু। দীর্ঘ পরিক্রমায় এখনও সেই সুনাম ধরে রেখেছেন চমচম ব্যবসায়ীরা।”
জয় কালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বপন ঘোষ বলেন, “আমার বাবা ১৯৩৯ সাল থেকে মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেন। সেখান থেকে আমিও মিষ্টির ব্যবসা করছি। আমার পরের জেনারেশনে আমার ছেলেও আছে। মূলত এই পোড়াবাড়ির চমচমের উৎপত্তি হয়েছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে।”
চমচমের স্বাদ ও মান বিষয়ে স্বপন ঘোষ বলেন, “চমচম সুস্বাদু হওয়ার একটা কারণ হচ্ছে- চরাঞ্চল থেকে যে সমস্ত গাভীর দুধ আসে, সেগুলো অনেক ভালো। আর জলেরও একটা বিষয় আছে। দুধ, জল ও কারিগরের সমন্বয়েই এই মিষ্টির স্বাদ হয়। মিষ্টিগুলো খুবই প্রাকৃতিক। মিষ্টি তৈরিতে কোনও ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। এসব কারণেই চমচম বিখ্যাত হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশে এই পোড়াবাড়ির মিষ্টির সুনাম রয়েছে। তবে তৎকালীন সময়ে মিষ্টির যে ফ্লেভার ছিল, সেটা বর্তমানে নেই। আমরা চেষ্টা করছি আগের ফ্লেভার ধরে রাখতে। তারপরও টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির মিষ্টির চেয়ে কোথাও আর ভালো মিষ্টি তৈরি হয় না।”
তবে আধুনিকতার এই সময়ে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির মান ও স্বকীয়তা ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে উৎপাদন, মানসম্মত দুধের ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুত প্রণালির সংরক্ষণ, এসব বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পোড়াবাড়ির চমচমসহ টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে স্থানীয় কারিগর ও উদ্যোক্তারা আরও উপকৃত হতে পারেন।
আরমান কবীর: দেশের আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সংযোগ অধিশাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারি কার্যাবলি তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপদের।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক জরুরি কর্মসূচি হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নির্মূল নিশ্চিত করা। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে আরও কার্যকর তদারকি ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে এই দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার মতো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্ব সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে দেওয়াকে তাঁর প্রতি সরকারের আস্থা ও প্রত্যাশার গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন দায়িত্বে তিনি ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের তদারকিতে ভূমিকা রাখবেন।
এদিকে, টাঙ্গাইলের সন্তান সুলতান সালাউদ্দিন টুকু রাজধানী ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্ব পাওয়ায় টাঙ্গাইলবাসীর মধ্যেও আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মনে করছেন, জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা টুকুর ওপর ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্ব অর্পণ টাঙ্গাইলের জন্যও গর্বের বিষয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু নতুন দায়িত্বে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করছেন তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
আরমান কবীর:টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সুনাম ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশে। বাংলাদেশ তথা দেশের বাহিরে টাঙ্গাইলের পরিচিতি রয়েছে তাঁতের শাড়ি, চমচম ও মধুপুরের আনারসের জন্য। কিন্তু কালের আবর্তে সেই ঐতিহ্যের তাঁতের শাড়ির কারিগররা আজ অস্তিত্বের সংকটে।
উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ, অথচ বাড়েনি তাঁতিদের মজুরি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ডিপিডিটি টাঙ্গাইল শাড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প নানা সংকটে ধুঁকছে।
অন্যদিকে, বাজারে পাওয়ার লুমে তৈরি কম দামের শাড়ির দাপটে হস্তচালিত তাঁতের শাড়ির চাহিদা আরও কমেছে। এ ছাড়াও বর্তমানে নারীদের শাড়ির চেয়ে থ্রি পিস, সালোয়ার কামিজের প্রতি ঝুঁকে পড়াও এই শিল্পের সংকটের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন তাঁত সংশ্লিষ্ট অনেকে।
এই ত্রিমুখী সংকটে সংসারের চাকা সচল রাখতে পূর্বপুরুষের শত বছরের পেশা ছেড়ে রিকশা, অটোরিকশা চালানো, চায়ের দোকান কিংবা দিনমজুরির মতো পেশায় ঝুঁকছেন টাঙ্গাইলের অনেক তাঁতি। অনেকেই পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
জেলা তাঁত বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, বাসাইল ও দেলদুয়ারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার হস্তচালিত তাঁত চালু রয়েছে। বন্ধ রয়েছে প্রায় তিন হাজার তাঁত। অন্যদিকে, পাওয়ার লুমের সংখ্যা জেলায় ২০ থেকে ২৫ হাজার। কম দামে বেশি উৎপাদনের কারণে পাওয়ার লুমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে হস্তচালিত তাঁত শিল্প।
সরেজমিনে টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লী খ্যাত দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, সুতা, রং ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শাড়ি উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাড়েনি।
সপ্তাহজুড়ে কঠোর পরিশ্রম করে দুই থেকে তিনটি শাড়ি বুনে যে আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাথরাইল এলাকার তাঁতি অভিজিৎ বসাক বলেন, “তাঁত বুনে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সব তাঁত বিক্রি করে দিয়েছি। এখন তাঁতঘরে চায়ের দোকান করেছি। এই কাজ না করলে পরিবার চালানো সম্ভব হতো না।”
একই এলাকার তাঁতি অমিত বসাক বলেন, “আগে একটি শাড়ি বুনতে তিন থেকে চার দিন লাগলেও তখন হাতে বোনা শাড়ির মূল্য ছিল। কিন্তু এখন পাওয়ার লুমে দিনে ১৫ থেকে ২০টি শাড়ি তৈরি হচ্ছে। সেই প্রতিযোগিতায় হস্তচালিত তাঁত টিকতে পারছে না।” ফলে অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশাকে বেছে নিয়েছে।
পাথরাইলের চন্ডী এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তাতী জানান,“একটি টাঙ্গাইল জামদানি শাড়ি বুনতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। একটি শাড়ির জন্য মজুরি পান ৮৫০ টাকা। সপ্তাহে দুই-তিনটির বেশি শাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয় না। ফলে এই আয় দিয়ে কোনোভাবেই সংসারের ব্যয় মেটানো যায় না।”
অনেকেই পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে সুনামের সাথে তাঁতের শাড়ি বুনছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো আছেন তারা। কিন্তু টাঙ্গাইলের তাঁতীদের অধিকাংশই ভালো নেই।
পাথরাইল এলাকার শাড়ি ব্যবসায়ী সুবির বসাক বলেন, “হাতে বোনা কাপড়ের এখনও আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় এর দামও বেশি পড়ে। একই ডিজাইনের শাড়ি পাওয়ার লুমে অনেক কম খরচে তৈরি হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই ঝুঁকছেন। এতে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে।”
টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, “শাড়ির দাম কমে যাওয়ায় তাঁতিদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে দক্ষ কারিগররা একে একে পেশা ছাড়ছেন। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “তাঁতিদের পাশাপাশি লোকসানের মুখে পড়ে অনেক ছোট ও মাঝারি তাঁত মালিকও তাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দক্ষ কারিগরের সংকটে অনেক সচল তাঁতও এখন অচল হয়ে পড়ছে।”
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের টাঙ্গাইল বেসিস সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার জায়দুর রহমান জানান, হস্তচালিত তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও বিপণন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে তাঁতিদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়েছে। পাশাপাশি টাঙ্গাইলে একটি শাড়ি বিপণন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম টাঙ্গাইলের বাজিতপুরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। টাঙ্গাইলে তাঁতের শাড়ি জিআই পন্য স্বীকৃতি । আধুনিক প্রযুক্তি যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তাঁতিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং তরুণ প্রজন্মকে তাঁত শিল্পে আগ্রহী করে তুলবে। তাঁতিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা সহায়তা করা হবে।
তাঁত সংশ্লিষ্টদের মতে, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, বাজারে প্রকৃত টাঙ্গাইল শাড়ির সুরক্ষা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প।
আরমান কবীর:বাকরখানি শুধু একটা রুটি না, এটা মুঘল আমলের একটা প্রেম-কাহিনী আর ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকার বাকরখানি এখন তৈরি হচ্ছে টাঙ্গাইল শহরেই।
শহরের পার্ক বাজারের ব্যস্ততম এলাকা শনির আখড়ার সামনে ৩৭ বছরের অভিজ্ঞ কারিগর সোহেল মিয়া তৈরি করছেন বাকরখানি। তার হাত ধরেই মুঘল আমলের স্বাদ এখন টাঙ্গাইলবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে।
সোহেল মিয়ার দোকানে মিষ্টি ও নোনতা দুই ধরনের বাকরখানি পাওয়া যায়।
দাম প্রতি কেজি মিষ্টি বাকরখানি ২২০ টাকা, নোনতা ২০০ টাকা। প্রতি পিস ১০ টাকা। কেজিতে গড়ে ২৪টি বাকরখানি ধরে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাকরখানির মিষ্টি সুগন্ধ পুরো এলাকায় এক ধরনের আবেশ তৈরি করছে। দিনে গড়ে ৪ হাজার টাকার বাকরখানি বিক্রি হচ্ছে এখানে। ভাগিনা শাহিন মিয়া মামাকে সাহায্য করেন। পরিবার নিয়ে তারা থাকেন শহরের আদালত পাড়া এলাকায়।
সোহেল মিয়ার আদি বাড়ি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে। প্রায় ২৫ বছর আগে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে এসে বাকরখানি তৈরির কাজ শেখেন। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে এই পেশায় আছেন।
দুই বছর হলো টাঙ্গাইলে এসেছেন। পার্ক বাজারে মির্জা বাহরুলের দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন।
তিনি বলেন, “আগে লাকড়ি বা কয়লার চুলায় বাকরখানি তৈরি হতো। এখন মাইক্রোওভেনে বানাই। টাঙ্গাইলের মানুষ এখনও পুরোপুরি বাকরখানি খাওয়া শেখেনি। তবে ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়ছে।”
তিনি আরো বলেন,ঘি, ময়দা, চিনি, দুধ, তিল – এগুলোই বাকরখানির মূল উপাদান।
কোদালিয়া এলাকার নাজমুল আহসান ঢাকার লালবাগে থাকতেন। সেখান থেকেই সকালের চায়ের সাথে বাকরখানি খাওয়ার অভ্যাস। তিনি বলেন, “পরিবারের জন্য ২ কেজি নোনতা বাকরখানি নিলাম। সকাল-সন্ধ্যার চায়ের সাথে খাব।”
স্কুলপড়ুয়া ছেলে মাহিনকে নিয়ে আসা মিলি বেগম বলেন, “ছেলের পছন্দ মিষ্টি বাকরখানি। তাই ১ কেজি ২২০ টাকা দিয়ে কিনলাম। এখানকার স্বাদ ও মান দুইটাই ভালো। বাজার করার ফাঁকে মাঝে মাঝে কিনে নিয়ে যাই।”
জানা গেছে,বাকরখানির জন্ম ১৭ শতকে মুঘল আমলের ঢাকায়। মুঘল সুবেদার ও নবাবরা সকালের নাস্তা ও চায়ের সাথে এটা খেতেন কারণ এটি সহজে নষ্ট হয় না।
নামকরণের পেছনে আছে করুণ প্রেম কাহিনী। মুঘল আমলে ঢাকার নায়েবে নাজিম মির্জা বাকর খান প্রেমে পড়েন নর্তকী খানি বেগমের। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে তাদের মিলন হয়নি। শোকে বাকর খানের জন্য রাঁধুনি যে শক্ত রুটি বানিয়েছিলেন তার নাম হয় বাকর + খানি = বাকরখানি।
আদিতে এই সুস্বাদু খাদ্য ২ প্রকার ছিল, গায়ে গায়ে বাকরখানি: পাতলা, খাস্তা। চায়ে ভিজিয়ে খাওয়া হতো। চাল্লা বাকরখানি: মোটা, নরম। উপরে তিল-পোস্ত দেওয়া থাকতো।পরে যোগ হয় মিষ্টি, নোনতা, চিনি ও মাওয়া বাকরখানি। ব্রিটিশরা একে “Bengal Biscuit” বলতো। পুরান ঢাকার লালবাগ, নাজিরাবাজার, চকবাজার ছিল এর মূল কেন্দ্র। দেশভাগের পর এটি সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
মুঘল আমলের সেই প্রেম আর ঐতিহ্যের বাকরখানি এখন টাঙ্গাইলের পার্ক বাজারে নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে। সোহেল মিয়ার মতো কারিগরদের হাত ধরে ঐতিহ্য টিকে থাকুক – এমনটাই প্রত্যাশা টাঙ্গাইলবাসীর।
আরমান কবীরঃ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, টাঙ্গাইল জেলার মানুষ যাতে উন্নত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পায়, সে লক্ষ্যে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। হাসপাতালের জনবল সংকট দ্রুত নিরসনের চেষ্টা করা হবে। তবে নতুন জনবল নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান জনবল দিয়েই সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সভায় টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এই সব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, চিকিৎসা পেশা অত্যন্ত মানবিক ও দায়িত্বপূর্ণ। মানুষ অসুস্থ হলেই সর্বপ্রথম হাসপাতালের শরণাপন্ন হয়। তাই চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সীমিত জনবল থাকলেও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
এ সময় তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্বিক সেবার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মুস্তাফিজুর রহমান, জেলা প্রশাসক শরীফা হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সঞ্জয় কুমার মহন্ত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম, টাঙ্গাইল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভু রাম পাল, সিভিল সার্জন ডা. ফরাজী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম মঞ্জু, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নূরুল আমিন মিঞা, হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল কুদ্দুস, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু ,সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন, চিকিৎসকবৃন্দ এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে হাসপাতালের পরিচালক স্বাগত বক্তব্য দেন এবং হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম, বিদ্যমান সমস্যা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
সভায় হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল সংকট দূরীকরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, রোগীদের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান বৃদ্ধি, ওয়ার্ডের পরিবেশ উন্নয়ন, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং অ্যাম্বুলেন্স সেবার উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়।
আরমান কবীরঃ একসময় টাঙ্গাইলের মানুষ জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য ঢাকা-ময়মনসিংহমুখী হতেন। অ্যাম্বুলেন্সে ৩-৪ ঘণ্টার যাত্রা, পথে রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার আশঙ্কা ছিল নিত্যসঙ্গী। সাথে যোগ হতো অতিরিক্ত অর্থ খরচ।
কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র পাল্টেছে। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল ও টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ৭৫০ সজ্জার সমন্বিত মেডিকেল হাব। এটিকে এখন জেলার চিকিৎসা খাতের ‘নতুন দিগন্ত’ বলছেন সবাই। সঙ্গত কারণেই চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও ময়মনসিংহ মুখি রোগীর স্রোত কমেছে অনেকটাই।
শহরের উত্তর দিকে পাশাপাশি অবস্থিত এই দুটি হাসপাতাল। জেনারেল হাসপাতাল ৫০ শয্যার সেবা দিয়ে আসছে সেই ১৯৭৪ সাল থেকে। পরে এটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নিত করা হয়।
২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি কলেজটির প্রথম ব্যাচের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার মাধ্যমে এর একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়।এখন চিকিৎসা ও শিক্ষার বড় কেন্দ্র এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দুই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রোগী রেফার, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কনসালটেশন ও যন্ত্রপাতির শেয়ারিং হওয়ায় সেবার মান বেড়েছে বহুগুণ।
বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময় এই হাবই ছিল জেলার ভরসা। আইসোলেশন ওয়ার্ড, আইসিইউ, অক্সিজেন সাপ্লাই সব একসাথে ম্যানেজ করে প্রাণ বাঁচিয়েছে জেলার হাজারো মানুষের।
আগে সিটি স্ক্যান, হার্টের ইকোর জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হতো। এখন টাঙ্গাইলেই মিলছে এই সেবা। গত ৩ বছরে সরকারি বরাদ্দে যুক্ত হয়েছে, ১টি সিটি স্ক্যান, ল্যাপারোস্কপি সেট ও আধুনিক ল্যাব।
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস জানান ,“আমরা এখন ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, বড় অপারেশন, ট্রমা কেস সবই এখানে ম্যানেজ করছি। মেডিকেল শিক্ষার্থী ও ইন্টার্নরা ২৪ ঘণ্টা থাকায় জরুরি সেবা আগের চেয়ে ৫০% দ্রুত হয়েছে।”
তিনি আরো জানান,খুব দ্রুতই নাক,কান গলা (ইএনটি) বিভাগ, চক্ষু বিভাগ ও আই সি ইউ ইউনিটের চালুর প্রচেষ্টা চলছে। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সহযোগিতায় খুব দ্রুতই এই বিভাগ গুলো চালু করা হবে।আরেকটি চ্যালেঞ্জ জনবল। ৫০০ শয্যার বিপরীতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা কম। পদ ফাঁকা থাকায় চাপ বাড়ছে কর্মরতদের উপর।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডঃ সাইফুর রহমান খান বলেন, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে সম্প্রতি ১০ শয্যার আইসিইউ চালু করা হয়েছে। এ ছাড়াও ডাইরিয়ার ও হামের আলাদা ইউনিট রয়েছে। টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পরও ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে এখন প্রায় ৪০০ রোগীর সেবা দেওয়া হচ্ছে, যেটা জেনারেল হাসপাতালে সেবার মান ভালোর অন্যতম নির্দেশক। আশা করি, ভবিষ্যতে এই সেবার মান নিশ্চিত করতে সরকার মহোদয় জেনারেল হাসপাতালের জনবলের অভাব পুরণে সহায়তা করবেন।
সখীপুরের রেহেনা বেগম সিজারের জন্য এসেছেন। তিনি বলেন, “আগে ঢাকার কথা শুনলেই ভয় লাগত। এখন এখানেই ভালো ডাক্তার, ভালো অপারেশন। খরচ অর্ধেক।”সরকারকে ধন্যবাদ।
দেলদুয়ার উপজেলার জাঙ্গালিয়ার গ্রামের আহমেদ আলী(৭৪)র স্ট্রোক হয়েছিল আট দিন আগে। আট দিনের চিকিৎসার শেষে পর আজকে তাকে রিলিজ করেছে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট, তিনি জানান, টাঙ্গাইলে চিকিৎসা সেবার অনেক উন্নত হয়েছে, আগে স্ট্রোকের চিকিৎসা টাঙ্গাইলে ছিলনা, ঢাকায় রেফার্ড করা হতো, এখন টাঙ্গাইলে স্ট্রোকের উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নের দেলদা গ্রামের মিনা চৌধুরী (৬০) পেটে ব্যথা ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।তিন দিনের চিকিৎসা শেষে আজকেই তিনি বাড়ি ফিরছেন, হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় তিনি সন্তুষ্ট। পরিবার পরিজনের সাথে হাসি মুখে বাড়ী ফিরছেন তিনি।
তবে অভিযোগও আছে বিস্তর। ওয়ার্ডে বেডের চাপ, টয়লেটের সংকট ও বিশুদ্ধ পানির দাবি জানিয়েছেন অনেকে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এ ছাড়াও এক শ্রেণীর ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল ও মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভদের দৌরাত্ম্যে রয়েছে।
এছাড়াও লোকেশনের সমস্যা আছে। হাসপাতালের কাছেই নতুন বাস টার্মিনাল। ফলে অ্যাম্বুলেন্স আটকায়, রোগীর স্বজনদের ভোগান্তি হয় যানজটের কারণে।
টাঙ্গাইল সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি অকিবুর রহমান ইকবাল বলেন, “রাবনায় নতুন টার্মিনাল হলে এই মেডিকেল হাব আরও প্রাণ ফিরে পাবে।”
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন,সরকারের পরিকল্পনা বড়। ক্যান্সার ইউনিট, বার্ন ইউনিট, ক্যাথল্যাব ও পেডিয়াট্রিক আইসিইউ স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন। মেডিকেল কলেজে গবেষণা সেল চালু হলে নতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়েও কাজ হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালনা পরিষদের গত ১১ জুন সভাপতি নির্বাচিত হন।
দায়িত্ব নিয়েই তিনি বলেন “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে টাঙ্গাইলকে আমরা স্বাস্থ্যসেবার মডেল জেলা হিসেবে গড়তে চাই। ৭৫০ সজ্জার এই হাব হবে তারই শুরু।”
টাঙ্গাইলের এই মেডিকেল হাব এখন আর শুধু একটি জেলার হাসপাতাল নয়। এটি উত্তরবঙ্গের ৫-৬টি জেলার মানুষের ভবিষ্যতে ভরসার স্থল হয়ে উঠবে এমন প্রত্যাশা অভিজ্ঞ জনের । চ্যালেঞ্জ আছে, তবে সম্ভাবনা তার চেয়ে বড়।
পর্যাপ্ত বরাদ্দ, জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে টাঙ্গাইল হবে দেশের অন্যতম আধুনিক চিকিৎসা নগরী। আর তখন ঢাকামুখী রোগীর স্রোত কমে, টাঙ্গাইল মুখী হবে স্বাস্থ্যসেবার নতুন স্রোত। এমন প্রত্যাশা টাঙ্গাইলের সাধারণ মানুষের।
টাঙ্গাইলের দু’টি হাসপাতালে মিলছে উন্নত চিকিৎসা