আ’লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের নামের হসপিটাল সিলগালা, ক্ষুব্ধ জেলাবাসি


২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫২৭ বার পঠিত
Ekotar Kantho
শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটাল

একতার কণ্ঠঃ টাঙ্গাইলে লাইসেন্স ব্যতিতই চলছে প্রায় দুই শতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। নানা প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ওই ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চলমান থাকলেও লাইসেন্স নবায়ন না থাকার অজুহাতেই সিলগালা করা হয়েছে আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের নামকরণের হসপিটালটি।

জাতীয় নেতার নামে গড়ে উঠা শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটালটি সিলগালা করার ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরাসহ সাধারণ মানুষ। আওয়ামীলীগ কে বিতর্কিত করতেই ও অদৃশ্য কোন মহলের প্ররোচনায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এর নামের হসপিটালটি সিলগালা করেছে এমন অভিযোগ স্থানীয় নেতাকর্মীদের। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলার সাধারণ মানুষও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৩৫০টিরও বেশি রয়েছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে বৈধ কাগজ পত্র রয়েছে ৮৯টির আর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ৫৮টির।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের নামে পরিচালিত হচ্ছে এই হসপিটাল। এখানে বিনা পয়সা গরীব রোগীদের চিকিৎসা দেয়াসহ খুব অল্প টাকায় নানা ধরণের জটিল অপারেশন করে থাকেন হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। এতে অন্যান্য ক্লিনিকের ব্যবসা নষ্ট হচ্ছে। এ ক্ষোভেই ওই ক্লিনিক মালিকরা ষড়যন্ত্র করে হসপিটালটি বন্ধ করিয়েছেন। জেলায় অবৈধভাবে অসংখ্য ক্লিনিক পরিচালিত হলেও লাইসেন্স নবায়ন না থাকার মত কারণে আওয়ামীলীগের মহান নেতা শামসুল হকের নামে প্রতিষ্ঠিত এ হসপিটালটি সিলগালা করার ঘটনাটি রহস্যজনক বলে দাবি করেছেন তারা। দ্রুত হসপিটালটি খুলে দেয়ার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনাও করেছেন তারা।

১৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল মালেক তপু’র অভিযোগ , মহান নেতার নামে প্রতিষ্ঠিত হসপিটালটিকে বিতর্কিত করাসহ টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের ইতিহাস ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা চেষ্টা চলছে। যে হসপিটালটি প্রতিষ্ঠান লগ্ন থেকে লাইসেন্সসহ সকল প্রকার বৈধতা নিয়ে গরীব অসহায় মানুষের সেবা চালিয়ে যাচ্ছে, করোনা এই দূর্যোগে সেই প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স নবায়ন করতে না পারার বিষয়টি সিলগালা করার মত অপরাধ ? জেলায় যেখানে অবৈধভাবে চলছে প্রায় দুই শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এই বিপুল সংখ্যক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার যদি অবৈধভাবে চলতে পারে সেখানে মহান নেতার নামে প্রতিষ্ঠিত শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটালটির অপরাধ কি ? এটি সিলগালা করার বিষয়টি কি রহস্যজনক নয় ? আমার ধারণা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের জামায়াত শিবিরের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারি বর্তমান সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে হসপিটালটি সিলগালা করার মত ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। ঘটনাটি তদন্তে জেলা প্রশাসনের উচ্চতর কমিটি হস্তক্ষেপ ও জড়িতদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

টাঙ্গাইল শহর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান খান শাকিব বলেন, মহান নেতার নামে প্রতিষ্ঠিত শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটালটি ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ অঞ্চলের গরীব অসহায় মানুষকে বিনা পয়সা সেবা দিয়ে আসছে। এছাড়াও মহান নেতার নাম উজ্জল করতে এই হসপিটালে হয়ে আসছে অল্প টাকায় নানা ধরণের অপারেশন। জেলায় অসংখ্য ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবৈধভাবে পরিচালিত হলেও প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই লাইসেন্সসহ সকল প্রকার বৈধতা নিয়েই পরিচালিত হয়ে আসছিল এ হসপিটালটি। সম্প্রতি জানতে পারলাম লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দায়িত্বরত ডাক্তার না থাকায় হসপিটালকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করাসহ সিলগালা করা হয়েছে। এ অপরাধে হসপিটালটির জরিমানা বিষয়টি মেনে নেয়া গেলেও সিলগালা করার বিষয়টি আমি মানতে পারছিনা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ কারো প্ররোচনায় এটি করছেন কিনা এ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ আমি। মহান নেতার নামে প্রতিষ্ঠিত হসপিটাল সিলাগালা করাটা কতটা যৌক্তিযুক্ত সে বিষয়টি দেখতে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সরকারি এম এম আলী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও আওয়ামীলীগ নেতা বিপ্লব আরেফিন খান বলেন, অভিযানের দিন আমি হসপিটালে উপস্থিত ছিলাম। মহান নেতার নামে প্রতিষ্ঠিত এ হসপিটালটিতে বিনা পয়সায় চিকিৎসাসহ অল্প টাকায় নানা ধরণের অপারেশনের সুবিধা পায় সাধারণ মানুষ, এ বিষয়টি আমি ভ্রাম্যামান আদালত কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছিলাম। হসপিটালটি সিলগালা না করে ত্রুটি সংশোধনের জন্য আমি সময় দেয়ার জন্যও অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমিসহ স্থানীয় অন্যান্যদের অনুরোধ না রেখে হসপিটালটি সিলগালা করেছেন।

তিনি বলেন, যে অপরাধে মহান নেতা শামসুল হকের নামে প্রতিষ্ঠিত হসপিটালটি সিলগালা করা হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি অপরাধ নিয়ে এই শহরেই চলছে অসংখ্য ক্লিনিক। অবৈধ ওই ক্লিনিক গুলো সচল রেখে শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটাল সিলগালা করাটি খুবই দুঃখজনক। এছাড়াও ওই দিনের পরিচালিত অভিযানে আরো কয়েকটি ক্লিনিককে সময় দেয়া হলেও সিলগালা করা হয় শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটারটি। দ্রুত প্রতিটি অবৈধ ক্লিনিককে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে লাইসেন্সসহ সকল প্রকার সরকারি নির্দেশনা মেনে টাঙ্গাইল পৌর শহরের থানাপাড়া শান্তি কুঞ্জের মোড়ে যাত্রা শুরু করে শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটাল। ১৯১৬; ৪২২২ রেজিস্ট্রেশনকৃত ১০ শষ্যার এই হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন চিকিৎসক, একজন মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট, চারজন নার্স, একজন ল্যাব টেকনেসিয়ানসহ তিনজন আয়া।

শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটাল এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা. মো. সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, ২০২০সালের জুন পর্যন্তÍ লাইসেন্স নবায়ন ফি জমা দেয়া আছে। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে সংশ্লিষ্ট অফিস কার্যক্রম এখনও আমি নবায়নের কাগজ হাতে পাননি। এর ফলে চলতি বছরের নবায়নও করা যায়নি। দ্রুতই চলতি বছরের নবায়ন করা হবে। আবেদন ও নবায়ন ফি জমা দেয়ার বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ অবগত ছিল। এরপরও নবায়নের জন্য সাতদিনের সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে সে সময়টুকু না দিয়ে হসপিটালের অপারেশন থিয়েটার, কেবিন, ওয়ার্ড সিলগালা করা হয়েছে। এরপরও হসপিটাল ভবনের ৪র্থ তলায় একজন স্টাফ সন্তান নিয়ে থাকেন তাকেও সেখান থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও ৪র্থ তলাটি হসপিটালের কোন অংশ না।

দেলদুয়ার উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি লায়ন এম শিবলী সাদিক বলেন,পরিচালিত অভিযানের বিষয়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ আমাদের কিছুই অবগত করেননি। লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দায়িত্বরত ডাক্তার না থাকার অপরাধে মহান নেতার নামে প্রতিষ্ঠিত শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটালের জরিমানা করার বিষয়টি ঠিক ছিল। তবে সিলগালা না করে বৈধ কাগজ পত্র করার সময় দেয়াটাই যৌক্তিক ছিল বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. সাহাবুদ্দিন খান বলেন , লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দায়িত্বরত ডাক্তার না থাকায় শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটালকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করাসহ সিলগালা করার নির্দেশ দিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক। সেটি শুধুই ভ্রাম্যমান আদালতের বিষয়। ওই নির্দেশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের কিছুই করার নেই। এরপরও হসপিটাল কর্তৃপক্ষ আমার কাছে এসেছিলেন আমি তাদের কাগজপত্র ঠিক করে আসতে বলেছি। কাগজপত্র ঠিক হলেই হসপিটাল চালু করার অনুমতি দেয়া হবে। এছাড়াও জেলায় অবৈধভাবে যে সকল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে সেগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালিত হবে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রানুয়ারা খাতুনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়। লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও দায়িত্বরত ডাক্তার না থাকায় শহরের শামসুল হক মেমোরিয়াল হসপিটালকে ১৫ হাজার টাকা ও সোনার বাংলা ক্লিনিক মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে দুটি ক্লিনিকই সিলগালা করা হয়। এ ছাড়াও ফাতেমা ক্লিনিক ও রোকেয়া আইকেয়ার সেন্টারকে ১৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করে বৈধ কাগজ পত্র করার জন্য সাত দিনের সময় দেয়া হয়েছিল।


ফেসবুকে আমরা...

কপিরাইট © ২০২১ একতার কণ্ঠ এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।