টাঙ্গাইলে বেড়েছে কিশোরদের মাদকাসক্তি; ইয়াবা-গাঁজায় জড়িয়ে বাড়ছে অপরাধ 


০১:৫২ পিএম, ৪ অগাস্ট ২০২৬
টাঙ্গাইলে বেড়েছে কিশোরদের মাদকাসক্তি; ইয়াবা-গাঁজায় জড়িয়ে বাড়ছে অপরাধ  - Ekotar Kantho
ফাইল ছবি 

আরমান কবীরঃ টাঙ্গাইল পৌর শহরে বেড়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী সহ কিশোরদের মাদকের প্রতি আসক্তি। তারা যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনের সাথে। বিশেষ করে ভয়ংকর মাদক ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের সাথে বেশি যুক্ত স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে এইসব শিক্ষার্থী সহ কিশোররা। প্রশাসনের লাগাতার অভিযান চললেও কমেনি মাদক সেবনের প্রবণতা।ফলে শহরে বেড়েছে অপরাধের হার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌর শহরের ক্যাপসুল মার্কেট, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, বেড়াডোমা ব্রিজ পার, টাঙ্গাইল আউটার স্টেডিয়াম, হাউজিং মাঠ, সবুর খান টাওয়ারের সামনের রাস্তা, ছয়আনি পুকুর পার, টাঙ্গাইল সরকারি বিন্দুবাসিনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনের বড় পুকুর পার, শহিদ স্মৃতি পৌর উদ্যানের পেছনের নজরুল সেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাসহ পুরো গলি, পরিত্যক্ত ভাসানী হল চত্বর, কান্দাপাড়া, বাজিতপুর টেক্সটাইল মোড়, রাবনা বাইপাস , সৌখিন মৎস্য শিকারি সমিতির পাশে লেক পার সহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে এরা দলবেঁধে সন্ধ্যার পর মিলিত হয় মাদক সেবনে। এই সব আড্ডায় একই সাথে চলে মোবাইল জুয়া।

মাদকাসক্ত এই সব কিশোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন নামে গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখে। প্রশাসন কিম্বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কোন অভিযানের খবর এইসব গ্রুপের মাধ্যমে মুহূর্তেই সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায়।


এইসব ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে কোথায় মিলিত হতে হবে, কোন ধরনের মাদক বর্তমানে সহজলভ্য – এমন খবর সহজেই পেয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট গ্রুপের সদস্যরা।

এছাড়া শহরে মাদকের সংকট হলেই তারা মাদক সংগ্রহের জন্য মোটরসাইকেল , সিএনজি অটোরিকশা যোগে চলে যাচ্ছে শহরতলীর গালা ইউনিয়নের মনতলা, মগড়া ইউনিয়নের ছোট বাসালিয়া, ঘারিন্দা রেল স্টেশন, সন্তোষ, দাইন্না ইউনিয়নের শ্যামার ঘাট, অলোয়া জমিদার বাড়ির আশপাশের এলাকাসহ বাইপাস এলাকায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক বিক্রেতা জানান, এখন আর মাদক বিক্রির কোন নির্দিষ্ট স্পট নেই। মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় চাহিদা অনুযায়ী মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। ইয়াং জেনারেশনের কাছে এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা ইয়াবা ও গাঁজার। অর্ডার পেলে পৌর এলাকার যে কোন স্থানে তিনি ৩০ মিনিটের মধ্যে অর্ডারকৃত মাদকদ্রব্য পৌঁছে দেন। তবে দূরত্ব অনুযায়ী চার্জ ধরা হয়।”

শহরের নামকরা একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্র জানায়, শহরের আদালত পাড়ার এক বন্ধুর সাথে থেকে সে ইয়াবা খাওয়া শিখেছে। ইয়াবা না পেলে গাঁজা চলে। তবে মাদক ছাড়া তার একদমই ভালো লাগে না। এমনকি পরীক্ষার হলেও পরীক্ষা দেওয়ার পূর্বে মাদক সেবন করে যেতে হয়, না হলে তার মাথা কাজ করে না।

সে আরও জানান, বেশ কিছু দিন হলো প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে মাদক সেবনের সমস্যা হচ্ছে ও দামও বেড়েছে, তাই চেষ্টায় আছে কিভাবে মাদক সেবন থেকে বিরত থাকা যায়।

টাঙ্গাইল আউটার স্টেডিয়ামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দোকানদার জানান, প্রতিদিনই ঈদগাহে বসে জমজমাট মাদকের আড্ডা। শহরের বিভিন্ন এলাকার কিশোর-যুবকেরা এসে জড়ো হয় এই মাঠে, মাঝ রাত পর্যন্ত চলে মাদক সেবন, একই সাথে চলে মোবাইল জুয়া। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালালে কিছু দিন বন্ধ থাকে, তারপর আবার আগের মত চলে মাদক সেবন ও জুয়া।

এ প্রসঙ্গে সরকারি সৈয়দ মহব্বত আলী ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, সরকার ইদানিং মাদক ব্যবসায়ী সহ মাদক সেবীদের আটকে বেশ তৎপর। তারপরও থেমে নেই মাদক সেবন। শুধুমাত্র প্রশাসনিক তৎপরতা মাদকের ভয়াবহতা বন্ধ করতে পারবে না, এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সচেতনতা।

টাঙ্গাইল সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি আকিবুর রহমান ইকবাল বলেন, বিগত দিনে স্কুল- কলেজের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাং ও কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তি তৈরি হয়েছিল। সেই কালচার থেকে বের হয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগবে। বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। আশা করছি, খুব শীঘ্রই অবস্থার উন্নতি হবে। এ ছাড়াও মাদকের বিরুদ্ধে পারিবারিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।”

এ বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আহসান কবীর বুলবুলের সরকারি মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মাদকাসক্তি ও কিশোরদের মোবাইল গেমে আসক্তির কারণে টাঙ্গাইল পৌর শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তারা দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি উন্নতির দাবি জানিয়েছেন।


খবরটি শেয়ার করুন

কপিরাইট © ২০২২ একতার কণ্ঠ এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।