আরমান কবীর:টাঙ্গাইলকে যদি ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্লেষণ করি, তাহলে এর ৩টি পিলার পাব: তাঁত, আনারস, চমচম। তাঁত আজ অস্তিত্ব সংকটে। আনারস মৌসুমি। কিন্তু চমচম? ২০০ বছর ধরে সে একাই টাঙ্গাইলের “সফট পাওয়ার”।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পোড়াবাড়ি গ্রামটি ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত। নদীর পানিতে আয়রন ও মিনারেলের অনুপাত এমন যে ছানা কাটলে দানা হয় ঝরঝরে, কিন্তু শক্ত হয় না। দেশের অন্যান্য জেলার পানিতে সেই “মাউথফিল” আসে না।
টাঙ্গাইলের মিষ্টি তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ হলো তাজা দুধ। দুধ জ্বাল দিয়ে তা থেকে ছানা তৈরি করা হয়। এরপর ছানাকে কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে অতিরিক্ত পানি ঝরে যায়। নিচে রাখা বড় পাত্রে ছানা থেকে ঝরে পড়া তরল জমা হয়।
সাধারণ মেশিনে ১০ মিনিটে যে কাজ হয়, টাঙ্গাইলের চমচমের কারিগর হাতে ২ ঘণ্টা ধরে ছানা মথে। ফলে প্রোটিনের স্ট্রাকচার ভাঙে না। তাই কামড় দিলে দানাদার, কিন্তু গলে যায়।
ছানা প্রস্তুত হওয়ার পর তা ভালোভাবে মথে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়। এরপর চিনির ঘন সিরায় ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয়। দক্ষ কারিগরের হাতের নিপুণতায় সাধারণ ছানা তখন রূপ নেয় সুস্বাদু চমচমে।
ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরিতে যত্ন ও সময় প্রয়োজন হয়। ৬-৭ ঘণ্টা চিনির সিরায় ডোবানোর ফলে চমচমের চিনি ভেতরে ঢোকে। ফলে বাইরে ক্যারামেলাইজড লেয়ার তৈরি হয় আর ভেতরে ৭০% ময়েশ্চার। চমচম তৈরির এই পদ্ধতির কারণে প্রায় ২০০ বছরের খ্যাতি ধরে রেখেছে টাঙ্গাইলের চমচম।
বিদেশে রপ্তানি না হলেও অতুলনীয় স্বাদের কারণে এ জেলা থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় চমচম যায়। এ ছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে না হলেও ব্যক্তি পর্যায়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চমচম রপ্তানি করা হয়।
ইতিহাস বলছে- দশরথ গৌড় নামে এক ব্যক্তি ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর তীরবর্তী পোড়াবাড়িতে আসেন। তিনি যমুনার পানি ও গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে প্রথমে চমচম তৈরি শুরু করেন। পরে সেখানেই মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেন তিনি।
এর আগে ১৬০৮ সালে পোড়াবাড়ি গ্রামটিকে নদীবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সে সময়কালে ধলেশ্বরীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছিল জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র পোড়াবাড়ি বাজার। তখন পোড়াবাড়ি ঘাটে ভিড়তো বড় বড় সওদাগরি নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার। এ বাজারে যোগ হয় সুস্বাদু চমচম, গড়ে ওঠে মিষ্টির বাজার। ধীরে ধীরে পোড়াবাড়িতে প্রায় অর্ধশত চমচম তৈরির দোকান গড়ে ওঠে।
তবে এখন পোড়াবাড়ী নয়, মিষ্টি শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজার।
জেলায় চমচমের পাশাপাশি সাদা চমচম, রসগোল্লা, অমৃতী, পানতোয়া, কালোজাম, ক্ষীরমোহন, রসমালাই, মালাইকারী, ছানার পোলাও, দই (লাল), দই (সাদা), সন্দেশ, জিলাপি, ইত্যাদি এখন মন ভিজিয়েছে ভোজন রসিকদের। এ ছাড়াও রয়েছে জেলার মির্জাপুর উপজেলার জামুকীর কালিদাসের গুড়ের ও চিনির সন্দেশ। যা জেলাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে।
বর্তমানে মিষ্টি শিল্পে টাঙ্গাইলের ঘোষ ও পাল সম্প্রদায় বংশানুক্রমিক ভাবে নিয়োজিত আছে। তবে দে, নাগ ইত্যাদি উপাধিধারী অনেকেও মিষ্টান্ন তৈরিতে নিয়োজিত হয়েছেন। টাঙ্গাইলের মোদক উপাধি প্রাপ্তরাও মিষ্টি শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
টাঙ্গাইল শহর ও পোড়াবাড়ি মিলিয়ে ২০০টির অধিক মিষ্টির দোকান। প্রতিদিন গড়ে প্রতিটি দোকানে ৫ মণ, বছরে প্রায় ১৮০ মণ চমচম তৈরি হয়। প্রতি কেজি গড়ে ৩৫০ টাকা ধরলে শুধু চমচমের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ২৮ কোটি টাকা।
টাঙ্গাইলের মিষ্টির ঐতিহ্যের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানও জড়িত। জেলার বিভিন্ন মিষ্টির দোকান ও কারখানায় বহু মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। প্রতিদিন তাজা দুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ছানা তৈরি, মিষ্টি প্রস্তুত, প্যাকেটজাত ও বাজারজাত, পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ।
পোড়াবাড়ির মিষ্টি ব্যবসায়ীদের মধ্যে বর্তমানে খোকা ঘোষ ও গোপাল চন্দ্র দাস, গৌর ঘোষ, হারু ঘোষ, কানাই ঘোষ উল্লেখযোগ্য।
তবে পোড়াবাড়ি নয়, বর্তমানে টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজার মিষ্টি শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে। জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, গোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও টাঙ্গাইল পোড়াবাড়ি মিষ্টি ঘরে এখনও নির্ভেজাল পোড়াবাড়ির চমচম পাওয়া যায়। এই পাঁচআনি বাজারে প্রায় অর্ধশত মিষ্টির দোকান রয়েছে। আর যেখানে চমচমের জন্ম সেই পোড়াবাড়িতে এখন রয়েছে হাতেগোনা মাত্র চার থেকে পাঁচটি মিষ্টির দোকান।
টাঙ্গাইলের চমচম এখনও কেন এত জনপ্রিয়, সে তথ্য জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা সাহান হাসান ও উম্মে সালমা মাসুদ বলেন, “ছোট বেলায় দেখেছি হাতেগোনা কয়েকটি মিষ্টির দোকান ছিল। এখনতো প্রায় অর্ধশতাধিক দোকান হয়েছে। সে সময়ের মিষ্টির স্বাদ ও বর্তমানে যে স্বাদ তাতে অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু মিষ্টির গুণগত মান আগের তুলনায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। অন্যান্য মিষ্টির তুলনায় পোড়াবাড়ির চমচম অনেক সুস্বাদু। দীর্ঘ পরিক্রমায় এখনও সেই সুনাম ধরে রেখেছেন চমচম ব্যবসায়ীরা।”
জয় কালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বপন ঘোষ বলেন, “আমার বাবা ১৯৩৯ সাল থেকে মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেন। সেখান থেকে আমিও মিষ্টির ব্যবসা করছি। আমার পরের জেনারেশনে আমার ছেলেও আছে। মূলত এই পোড়াবাড়ির চমচমের উৎপত্তি হয়েছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে।”
চমচমের স্বাদ ও মান বিষয়ে স্বপন ঘোষ বলেন, “চমচম সুস্বাদু হওয়ার একটা কারণ হচ্ছে- চরাঞ্চল থেকে যে সমস্ত গাভীর দুধ আসে, সেগুলো অনেক ভালো। আর জলেরও একটা বিষয় আছে। দুধ, জল ও কারিগরের সমন্বয়েই এই মিষ্টির স্বাদ হয়। মিষ্টিগুলো খুবই প্রাকৃতিক। মিষ্টি তৈরিতে কোনও ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। এসব কারণেই চমচম বিখ্যাত হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশে এই পোড়াবাড়ির মিষ্টির সুনাম রয়েছে। তবে তৎকালীন সময়ে মিষ্টির যে ফ্লেভার ছিল, সেটা বর্তমানে নেই। আমরা চেষ্টা করছি আগের ফ্লেভার ধরে রাখতে। তারপরও টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির মিষ্টির চেয়ে কোথাও আর ভালো মিষ্টি তৈরি হয় না।”
তবে আধুনিকতার এই সময়ে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির মান ও স্বকীয়তা ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে উৎপাদন, মানসম্মত দুধের ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুত প্রণালির সংরক্ষণ, এসব বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পোড়াবাড়ির চমচমসহ টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে স্থানীয় কারিগর ও উদ্যোক্তারা আরও উপকৃত হতে পারেন।