টাঙ্গাইল পৌরসভার লাইসেন্সে ‘বৈধতা’ পাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিক্সা


০৯:১৪ পিএম, ২৩ মার্চ ২০২৩
টাঙ্গাইল পৌরসভার লাইসেন্সে ‘বৈধতা’ পাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিক্সা - Ekotar Kantho

একতার কণ্ঠঃ সারা দেশে যখন সবাই ব্যাটারিচালিত রিক্সা-ভ্যান বন্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাসহ এই ধরনের যান বন্ধে সোচ্চার তখন এ ধরণের অবৈধ যানকে লাইসেন্স দিচ্ছে টাঙ্গাইল পৌরসভা। এতে শহরে যেমন বেড়েছে যানজট তেমনি দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ সংকট।ফলে দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠেছে শহরবাসীর জীবন।

টাঙ্গাইল অ্যাডভোকেট বার সমিতির সভাপতি মোঃ মাঈদুল ইসলাম শিশির বলেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও টাঙ্গাইল পৌরসভা কর্তৃপক্ষের অটোরিক্সা ও ব্যাটারি চালিত রিক্সার লাইসেন্স প্রদান করা, হাইকোর্টের নির্দেশ অবমাননার সামিল। টাঙ্গাইলে যে কোন সচেতন নাগরিক সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে , মহামান্য হাইকোর্ট এই বিষয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করবেন।

২৯.৪৩ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের প্রথম শ্রেণীর টাঙ্গাইল পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের মোট সড়ক রয়েছে ৫৯০টি। ইতিমধ্যে টাঙ্গাইল পৌরসভা এই ৫৯০টি সড়কে চলাচলের জন্য লাইসেন্স দিয়েছে কয়েক সহস্রাধিক ব্যাটারিচালিত রিক্সাকে।

টাঙ্গাইল পৌরসভার লাইসেন্স বিভাগের তথ্য মতে, টাঙ্গাইল পৌরসভার লাইসেন্সপ্রাপ্ত অটোরিক্সার সংখ্যা ৪৫০০ আর রিক্সা রয়েছে ৫০০০। অটোরিক্সা লাইসেন্স ফি-১০,৫০০ আর পায়ে চালিত রিক্সার লাইসেন্স ফি-১০০০ টাকা।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যানিং অফিসার ও নগর পরিকল্পনাবিদ জহিরুল ইসলামের মতে যেকোন নগরীকে সচল রাখতে তার ধারন‌ ক্ষমতা অনুযায়ী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া উচিৎ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্যাটারী চালিত ওই মেট্রোরিক্সা গুলোর পিছনে বা চালকের বসার সিটের নিচে সাটানো হয়েছে টাঙ্গাইল পৌরসভার লাইসেন্স। টাঙ্গাইল পৌরসভার বর্তমান মেয়র এস.এম সিরাজুল হক আলমগীর স্বাক্ষরিত এক বছর মেয়াদী ওই লাইসেন্স গুলো ২০২১ সালে প্রথম দফায় অনুমোদন হয়েছে। যার ফলে কিছু রিক্সার লাইসেন্সের মেয়াদ দেখা গেছে ২০২১ থেকে ৩০ জুন ২০২২। ওই রিক্সা গুলোর লাইসেন্সের মেয়াদ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় স্বাক্ষরিত রিক্সার লাইসেন্সের মেয়াদ হয়েছে ২০২২ সাল থেকে ৩০ জুন ২০২৩ পর্যন্ত।

এছাড়াও নিয়ম বর্হিভুতভাবে এর আগেও তৎকালীন টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র দেন ৪০০০ হাজার ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সার (ইজি বাইক) লাইসেন্স। শহর জুড়ে এ সময় লাগামহীন যানজট লেগে থাকায় ওই ৪০০০ অটোরিক্সা চলাচলে দুই সিফট পদ্ধতি চালু করা হয়।

এরপর থেকে প্রতি সিফটে ২০০০ করে অটোরিক্সা চলাচল শুরু করে। এর ফাঁকে সড়কে নামতে শুরু করে ব্যাটারী চালিত মেট্রোরিক্সা। বর্তমানে শহর জুড়ে ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সার (ইজি বাইক) পাশাপাশি চলাচল করছে প্রায় ৭০০০ ব্যাটারী চালিত মেট্রোরিক্সা।

এছাড়াও রয়েছে লাইসেন্স প্রাপ্ত ৫০০০ পায়ে চালিত রিক্সা। বর্তমানে অটোরিক্সা (ইজি বাইক) দুই সিফট পদ্ধতিতে চলাচল করলেও সাত সহস্রাধিকের উপর মেট্রোরিক্সা চলছে দিনব্যাপি।

এছাড়াও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট বড় ১২৮টি পরিবহনসহ সরকারি বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বীমা, আদালতের যানবাহন, চিকিৎসক ও ব্যক্তি মালিকাধীন গাড়ীসহ গড়ে প্রতিদিন তিন সহস্রাধিক মোটর সাইকেল চলাচল করছে এই শহরে। যার ফলে শহরের প্রধান প্রধান সড়কের বেবীস্ট্যান্ড, শান্তিমুঞ্জ মোড়, মেইন রোড, নিরালা মোড়, পার্কবাজার মোড়, ক্যাপ্সুল মার্কেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, সুপারী বাগান মোড়, কলেজ গেইট আর নতুন বাস টার্মিনাল এলাকায় রীতিমত বেধে থাকছে যানজট।

যানজট নিরসনে মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এতে চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন রোগী, শিশু, বৃদ্ধ, মহিলাসহ নানা বয়সী যাত্রী আর সাধারণ মানুষ।

চালক ও যাত্রীদের অভিযোগ, ইতোপূর্বে পৌরসভা নির্ধারিত ১০,৫০০ টাকা ফি এর ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সার (ইজি বাইক) লাইসেন্স এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমান পৌর প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার পর এক বছর মেয়াদী পায়ে চালিত রিক্সার ১০০০ হাজার টাকার লাইসেন্স বিক্রি করেছেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। মেট্রোরিক্সার লাইসেন্সের কথা বলে অতিরিক্ত ওই টাকা গুলো নেয়া হয়েছে।

শহরের পশ্চিম আকুর টাকুর পাড়ার মেট্রোরিক্সা চালক মো. জসীম জানান, তিন বছর যাবৎ রিক্সা চালাচ্ছেন তিনি। রিক্সা ও গদি আটকে রেখে তাদের লাইসেন্স নিতে বাধ্য করা হয়েছে । লাইসেন্স ছাড়া চালানো যাচ্ছিল না বলেই তিনি লাইসেন্সটি নিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ২০/২৫ হাজার টাকায় পৌরসভা থেকে লাইসেন্স বিক্রি করা হলেও দেড় মাস আগে মুসলিমপাড়ার একজন গ্যারেজ মিস্ত্রির মাধ্যমে ১২ হাজার টাকায় লাইসেন্সটি নিয়েছেন তিনি। সুদের টাকায় রিক্সা আর লাইসেন্সটি কিনেছেন বলেও জানান তিনি।

বাসা খানপুর এলাকার আরেক মেট্রোরিক্সা চালক মো. হযরত বলেন, ২০ হাজার টাকায় তিনি লাইসেন্সটি পেয়েছেন। তার লাইসেন্স নম্বর ৮২৫। টাকা গুলো নিয়েছেন পৌরসভার লোকজন।

পায়ে চালিত রিক্সা লাইসেন্স কেন এত টাকা দিয়ে নিলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, লাইসেন্স বইয়ের মধ্যে ইজি বাইক লেখা আছে বলেই তিনি লাইসেন্সটি নিয়েছেন।

মেট্রোরিক্সা চালক রবিউল ইসলাম বলেন, পৌরসভা থেকে মেট্রোরিক্সার লাইসেন্স আর নম্বর প্লেট বিক্রি করার সুযোগে তারা এই ব্যাটারী চালিত রিক্সা চালাচ্ছেন। পৌরসভার লোকজন লাইসেন্স ও প্লেট বিক্রি করেছেন। এ কারণে এই রিক্সা বন্ধ হচ্ছেনা। এরপরও যদি সরকারিভাবে এই রিক্সা চলাচল বন্ধ করে, তাহলে অন্য কাজ করে খাবেন বলে জানান তিনি।

পৌরসভার কাজিপুর এলাকার ৪৯৯৫ নং লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাটারি রিক্সা চালক রফিক বলেন, ৪৩ হাজার টাকায় পুরাতন এই রিক্সাটি কিনেছি। মাসে ১২০০টাকা ভাড়ায় লাইসেন্সটি নিয়েছি। লাইসেন্সটি পৌরসভা থেকে কিনেছেন আদিটাঙ্গাইল এলাকার রিক্সার গ্যারেজ ব্যবসায়ি
আকবর।

রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সবুর বলেন, টাঙ্গাইল পৌরসভা থেকে চলাচলের জন্য ব্যাটারী চালিত মেট্রোরিক্সা (ইজি বাইক) গুলোকে পায়ে চালিত রিক্সার লাইসেন্স দিয়েছে। লাইসেন্স দেয়ার দায়িত্ব তাদের না। পৌরসভার মেয়র সাহেব পায়ে চালিত রিক্সার লাইসেন্স দিয়েছেন মেট্রোরিক্সায়। ব্যাটারী চালিত রিক্সা (ইজি বাইক) আমাদের সংগঠণের অন্তভুক্ত। এছাড়াও এই লাইসেন্স দেয়া নিয়ে আমাদের সাথে কোন মিটিং করেননি পৌর কর্তৃপক্ষ। ইজিবাইক বন্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্যের বিষয়টি মেয়র সাহেবের বলে জানান তিনি।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন ও যুবদের জন্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মুঈদ হাসান তড়িৎ বলেন, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পায়ে চালিত রিক্সা লাইসেন্স দিয়ে অবৈধ মেট্রোরিক্সার বৈধতা দেয়ার ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। দ্রুত অবৈধ ব্যাটারী চালিত রিক্সা গুলো বন্ধে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যানিং অফিসার ও নগর পরিকল্পনাবিদ জহিরুল ইসলাম জানান, আমার জানা মতে টাংগাইল পৌর এলাকায় কি পরিমান যানবাহন চলাচল করতে পারবে সেই বিষয়ে কোনো ধরনের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। তাই এটা সঠিক ভাবে বলা যাবে না টাঙ্গাইল পৌরসভায় ঠিক কি পরিমান সিএনজি,অটোরিক্সা, ও ব্যাটারীতে চালিত রিক্সা চলাচল করার অনুমতি দেওয়া যাবে। যেকোন নগরীকে সচল রাখতে তার ধারন‌ ক্ষমতা অনুযায়ী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া উচিৎ বলে তিনি মনে করেন।

টাঙ্গাইল অ্যাডভোকেট বার সমিতির সভাপতি মোঃ মাঈদুল ইসলাম শিশির বলেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও টাঙ্গাইল পৌরসভা কর্তৃপক্ষের অটোরিক্সা ও ব্যাটারি চালিত রিক্সার লাইসেন্স প্রদান করা, হাইকোর্টের নির্দেশ অবমাননার সামিল। টাঙ্গাইলে যে কোন সচেতন নাগরিক সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে , মহামান্য হাইকোর্ট এই বিষয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করবেন।

বক্তব্য নিতে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র এস.এম.সিরাজুল হক আলমগীর এর মুঠোফোনে ফোন দিলে সেটি রিসিভ করে পিএস সাজ্জাদ বলেন, এ ব্যাপারে সাক্ষাতে কথা বলা হবে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের (২০ জুন) সড়ক পরিবহনবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় সড়ক দুর্ঘটনারোধে সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিক্সা-ভ্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তীতে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর সারা দেশে চলা অবৈধ ব্যাটারিচালিত ৪০ লাখ ইজিবাইক বন্ধের নির্দেশসহ আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা আর অবৈধ ইজিবাইক আমদানি থেকে বিরত থাকতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে রুল জারি করেন বিচারপতি মামনুন রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ।


নিউজটি শেয়ার করুন

কপিরাইট © ২০২২ একতার কণ্ঠ এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।