মুঘল প্রেমের ঐতিহ্যের খাবার বাকরখানি এখন টাঙ্গাইলে


০৫:৩২ পিএম, ১১ জুলাই ২০২৬
মুঘল প্রেমের ঐতিহ্যের খাবার বাকরখানি এখন টাঙ্গাইলে - Ekotar Kantho
পার্ক বাজারে গরম গরম বাকরখানি তৈরি করছেন কারিগর সোহেল মিয়া।"

আরমান কবীর:বাকরখানি শুধু একটা রুটি না, এটা মুঘল আমলের একটা প্রেম-কাহিনী আর ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকার বাকরখানি এখন তৈরি হচ্ছে টাঙ্গাইল শহরেই।

শহরের পার্ক বাজারের ব্যস্ততম এলাকা শনির আখড়ার সামনে ৩৭ বছরের অভিজ্ঞ কারিগর সোহেল মিয়া তৈরি করছেন বাকরখানি। তার হাত ধরেই মুঘল আমলের স্বাদ এখন টাঙ্গাইলবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে।

সোহেল মিয়ার দোকানে মিষ্টি ও নোনতা দুই ধরনের বাকরখানি পাওয়া যায়।


দাম প্রতি কেজি মিষ্টি বাকরখানি ২২০ টাকা, নোনতা ২০০ টাকা। প্রতি পিস ১০ টাকা। কেজিতে গড়ে ২৪টি বাকরখানি ধরে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাকরখানির মিষ্টি সুগন্ধ পুরো এলাকায় এক ধরনের আবেশ তৈরি করছে। দিনে গড়ে ৪ হাজার টাকার বাকরখানি বিক্রি হচ্ছে এখানে। ভাগিনা শাহিন মিয়া মামাকে সাহায্য করেন। পরিবার নিয়ে তারা থাকেন শহরের আদালত পাড়া এলাকায়।

সোহেল মিয়ার আদি বাড়ি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে। প্রায় ২৫ বছর আগে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে এসে বাকরখানি তৈরির কাজ শেখেন। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে এই পেশায় আছেন।

দুই বছর হলো টাঙ্গাইলে এসেছেন। পার্ক বাজারে মির্জা বাহরুলের দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন।

তিনি বলেন, “আগে লাকড়ি বা কয়লার চুলায় বাকরখানি তৈরি হতো। এখন মাইক্রোওভেনে বানাই। টাঙ্গাইলের মানুষ এখনও পুরোপুরি বাকরখানি খাওয়া শেখেনি। তবে ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়ছে।”

তিনি আরো বলেন,ঘি, ময়দা, চিনি, দুধ, তিল – এগুলোই বাকরখানির মূল উপাদান।

কোদালিয়া এলাকার নাজমুল আহসান ঢাকার লালবাগে থাকতেন। সেখান থেকেই সকালের চায়ের সাথে বাকরখানি খাওয়ার অভ্যাস। তিনি বলেন, “পরিবারের জন্য ২ কেজি নোনতা বাকরখানি নিলাম। সকাল-সন্ধ্যার চায়ের সাথে খাব।”

স্কুলপড়ুয়া ছেলে মাহিনকে নিয়ে আসা মিলি বেগম বলেন, “ছেলের পছন্দ মিষ্টি বাকরখানি। তাই ১ কেজি ২২০ টাকা দিয়ে কিনলাম। এখানকার স্বাদ ও মান দুইটাই ভালো। বাজার করার ফাঁকে মাঝে মাঝে কিনে নিয়ে যাই।”

জানা গেছে,বাকরখানির জন্ম ১৭ শতকে মুঘল আমলের ঢাকায়। মুঘল সুবেদার ও নবাবরা সকালের নাস্তা ও চায়ের সাথে এটা খেতেন কারণ এটি সহজে নষ্ট হয় না।

নামকরণের পেছনে আছে করুণ প্রেম কাহিনী। মুঘল আমলে ঢাকার নায়েবে নাজিম মির্জা বাকর খান প্রেমে পড়েন নর্তকী খানি বেগমের। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে তাদের মিলন হয়নি। শোকে বাকর খানের জন্য রাঁধুনি যে শক্ত রুটি বানিয়েছিলেন তার নাম হয় বাকর + খানি = বাকরখানি।

আদিতে এই সুস্বাদু খাদ্য ২ প্রকার ছিল, গায়ে গায়ে বাকরখানি: পাতলা, খাস্তা। চায়ে ভিজিয়ে খাওয়া হতো। চাল্লা বাকরখানি: মোটা, নরম। উপরে তিল-পোস্ত দেওয়া থাকতো।পরে যোগ হয় মিষ্টি, নোনতা, চিনি ও মাওয়া বাকরখানি। ব্রিটিশরা একে “Bengal Biscuit” বলতো। পুরান ঢাকার লালবাগ, নাজিরাবাজার, চকবাজার ছিল এর মূল কেন্দ্র। দেশভাগের পর এটি সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

মুঘল আমলের সেই প্রেম আর ঐতিহ্যের বাকরখানি এখন টাঙ্গাইলের পার্ক বাজারে নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে। সোহেল মিয়ার মতো কারিগরদের হাত ধরে ঐতিহ্য টিকে থাকুক – এমনটাই প্রত্যাশা টাঙ্গাইলবাসীর।


খবরটি শেয়ার করুন

কপিরাইট © ২০২২ একতার কণ্ঠ এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।