টাঙ্গাইলে এমপিও নীতিমালার সুযোগ ভোগে মসজিদ প্রাঙ্গণে স্কুল স্থাপন


০৮:১৪ পিএম, ২৭ জানুয়ারী ২০২৪
টাঙ্গাইলে এমপিও নীতিমালার সুযোগ ভোগে মসজিদ প্রাঙ্গণে স্কুল স্থাপন - Ekotar Kantho
মসজিদ প্রাঙ্গনে স্থাপিত ভবানীপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি - একতার কণ্ঠ

একতার কণ্ঠঃ বেসরকারি বিদ্যালয় এমপিও নীতিমালার সুযোগ ভোগে মসজিদ প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে স্কুল। চাঞ্চল্যকর এমনটাই ঘটেছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ভবানীপুর গ্রামে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আর জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের যোগসাজসে গড়ে তোলা হয়েছে ভবানীপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি বিদ্যাপিঠ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সদ্য স্থাপিত বিদ্যালয় আর কর্মরত শিক্ষকদের এমপিও ভুক্ত করতে শিক্ষক প্রতি মোটা অংকের টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ডে স্থাপিত ২০১৫ সাল দেখানো হলেও চলতি জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে স্কুল কার্যক্রম বলে স্বীকার করেছেন কর্মরত শিক্ষক আর অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীরা।

অভিযোগ উঠা জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশিদ সদর উপজেলার আনেহলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক। ইতোপূর্বেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে সরকারিভাবে বন্ধ থাকা বৃত্তি পরীক্ষা টাঙ্গাইলে নিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির ভবন বিক্রির অভিযোগ।

এছাড়া ভবানীপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোতালেব মিয়া পেশায় একজন আইনজীবী সহকারি। কমিটির সভাপতি মোতালেব মিয়ার ছেলে শাকিল আহমেদ রয়েছেন ভবানীপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (এমএলএসএস) পিয়ন পদে কর্মরত।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১১০জন। কর্মরত শিক্ষক পদে ৫ আর (এমএলএসএস) পিয়ন পদে কর্মরত রয়েছেন ১ জন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দূর্গম এই গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন। বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য জমিও ক্রয় করা হয়েছে। ক্রয়কৃত জমির উপর বিদ্যালয় নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে মসজিদ প্রাঙ্গণে স্কুল স্থাপন আর জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির এমপিও ভুক্তির নাম ভাঙিয়ে আর অবৈধ প্রক্রিয়ার শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে মোটা টাকা বাণিজ্যের বিরোধীতা করছেন তারা।

বিদ্যালয়টির নির্দিষ্ট কোন ভবন না থাকলেও এটি এমপিও ভুক্ত হচ্ছে তথ্যটি যেমন সুখের, তেমনি শিক্ষক নিয়োগ আর এমপিও ভুক্তির লোভ দেখিয়ে ৫ শিক্ষকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেওয়ার সংবাদটি দুঃখজনক। নিয়োগপ্রাপ্ত তিন শিক্ষকের বয়স ৩২ বছরের উপরে হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে আর কোন পন্থায় নিয়োগ দেওয়া হলো সেটিসহ এত টাকা লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

ভবানীপুর গ্রামের মো. খাদেম আলী সরকার বলেন, চলতি মাসেই মসজিদ প্রাঙ্গণে বিদ্যালয়টি চালু করা হয়েছে।

স্থানীয় গ্রামের ছাত্র হারুন জানায়, মাসখানেক যাবৎ মসজিদ প্রাঙ্গণে বিদ্যালয়টি চালু হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী কতজন সেটি না জানলেও পাঁচজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে কর্মরত বলে জানান সে।

ভবানীপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী লামিয়া জানায়, মাত্র ১৬ দিন যাবৎ এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে সে।

পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র জুনায়েদ জানায়, প্রায় তিন সপ্তাহ হলো সে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আগে এখানে মক্তব ছিল, নতুন করে এই বিদ্যালয়টি চালু করা হয়েছে।

মসজিদের ঈমাম আবু রায়হান বলেন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোতালেব মিয়ার আত্মীয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। বিদ্যালয়ের জন্য মোতালেব মিয়া আবেদন করার কারণে মনে হয় তাদের যোগাযোগ হয়েছে। তবে টাকা লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি।

বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক আমিনা খাতুন রিমু বলেন, এমপিও করার আশ্বাসে বিদ্যালয়টি সম্প্রতি চালু করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত। এমপিও করে দেওয়ার আশ্বাসে তিনি এখানে শিক্ষকতা করছেন। টাকা লেনদেনের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি জানান, বিষয়টি আমার অভিভাবকরা বলতে পারবেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোজী বলেন, ২০১৫ সাল থেকে বিদ্যালয়ে কর্মরত। ভবন না থাকায় অস্থায়ীভাবে মসজিদ প্রাঙ্গণে চলতি জানুয়ারি থেকে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নদী পাড় হয়ে এই গ্রামের ছাত্র ছাত্রীদের অন্যত্র বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয় বলেই এখানে বিদ্যালয়টি গড়ে তোলা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশিদ আর বিদ্যালয়ের সভাপতি মোতালেব আঙ্কেলের সরকারি হওয়ার আশ্বাসে বিনা বেতনে তারা বিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনিসহ বিদ্যালয়ে কর্মরত অধিকাংশ শিক্ষকের বাড়ি শহরে বলেও জানান তিনি।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোতালেব মিয়া বলেন, টাকা লেনদেনের বিষয়টি তিনি জানেন না।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশিদ মিটিং এ আছি বলে এ বিষয়ে কোন বক্তব্য না দিয়েই ফোনটি কেটে দেন। এরপর থেকে অসংখ্যবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কাতুলী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড ভবানীপুর গ্রামের ইউপি সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি ওই গ্রামে বিদ্যালয়টি চালু হয়েছে। টাকা লেনদেনের বিষয়টি তিনি জানেন না।

কাতুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন মিয়া বলেন, ভবানীপুরে একটি বিদ্যালয় হবে, এটি আমি জানি। তবে মসজিদ প্রাঙ্গণে বিদ্যালয় স্থাপন ও শিক্ষক নিয়োগে টাকা লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুব্রত কুমার বণিক জানান, কাতুলী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ভবানীপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের একটি প্রস্তাবনা রয়েছে। এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের নামে যদি কেউ টাকা নেন বা চান তাহলে উনাকে থানায় হস্তান্তর করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।


নিউজটি শেয়ার করুন

কপিরাইট © ২০২২ একতার কণ্ঠ এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।