করোনার প্রভাবে অস্তিত্ব সংকটে টাঙ্গাইলের ঢুলি সম্প্রদায়


২২ এপ্রিল ২০২১ | ৬৯৪ বার পঠিত
Ekotar Kantho

একতার কণ্ঠ ডেস্কঃ বাংলা সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ঢুলি সম্প্রদায়। এ সংস্কৃতির ঐতিহ্যে বিকাশেও রয়েছে এ সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলা সংস্কৃতির যাত্রা, নাটক, বাউলগান, পালাগান হয়েছে এ সম্প্রদায়ের হাত ধরে সমৃদ্ধ। এ সম্প্রদায়ের উর্বর ভূমি টাঙ্গাইল জেলা। যার নিদর্শন এখনও ধরে রেখেছে জেলার ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউনিয়নের হামিদপুরের বায়ানপাড়ায় বসবাসরত ঢুলি সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার।

তবে করোনা ও লকডাইনের কারনে এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এ সম্প্রদায়ের কার্যক্রম। এর ফলে চরম অভাব অনটনে কাটছে এ সম্প্রদায়ের  দিন-কাল। করোনার প্রভাবে অস্তিত্বে সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলে ঢুলি সম্প্রদায় । পেটের দায়ে সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বেঁছে নিচ্ছেন অন্য পেশা। ঝুঁপড়ির ঘর, উন্মুক্ত পায়খানায় এ সম্প্রদায়ের শিশুসহ পরিবার গুলো যেমন রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে, তেমনি রয়েছে পরিবার পরিকল্পনা প্রদ্ধতি সম্পর্কে অসচেতনতা। গ্রামটিতে রয়েছে চরম পয়ঃনিস্কাশন সমস্যাও। মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যেও দিনদিন বাড়ছে এ গ্রামে বসবাসরত পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা।

জানা যায়, প্রায় ৩’শ বছর যাবৎ টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউনিয়নের হামিদপুরের বায়ানপাড়ায় বসবাস করে আসছে ঢুলি সম্প্রদায়ের এ পরিবার গুলো। ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের গ্রাম এই বায়ানপাড়া বা নার্গাচিপাড়া। ব্যক্তি মালিকাধীন ৫৯ শতাংশ জমির উপর অবস্থিত এ গ্রামটিতে বসবাসরত পরিবারের সংখ্যা শতাধিক হলেও এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২’শ জন। তাদের ভোটার সংখ্যা ১০৫জন। এছাড়াও ইসলাম ধর্মাবলম্বী এ সম্প্রদায়ের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন এই বাদ্যযন্ত্র। পরিবারের উপার্জনক্ষম শিশু থেকে বৃদ্ধ একজন হলেও রয়েছে এ পেশায় জড়িত। গ্রামটিতে বর্তমানে এ পেশার জড়িত রয়েছে বাসন্তী ব্যান্ড পার্টি, মনির ব্যান্ড পার্টি, বাংলাদেশ ভান্ডারী ব্যান্ড পার্টি, স্বপন ব্যান্ড পার্টি, শাহিন ব্যান্ড পার্টি, ফখর উদ্দিন ভাই ভাই ব্যান্ড পার্টি, সুমাইয়া ব্যান্ড পার্টি, বৃষ্টি ব্যান্ড পার্টি ও হৃদয়-রিপন ব্যান্ড পার্টির মত কয়েকটি দল।

এক একটি দলে কাজ করছে কমপক্ষে ১২জন সদস্য। বাংলা বছরের বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, অগ্রহায়ন, মাঘ আর ফাল্গুন এ সম্প্রদায়ের উপার্জনের সময়। এ সকল ব্যান্ড পার্টির একটি দলে কাজ করেন ৬জন বাঁশি বাদক, ১জন বাংলা সানাই বাদক, ১ জন জয় ঢাঁক বাদক, ১জন ঢোল বাদক, ১জন জুড়ি বাদক, ১ জন কারা বা ছোট জয় ঢাঁক বাদক আর ১জন করতাল বাদক। নাটক, যাত্রা, বাউলগান, পালাগান, হিন্দু বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পূঁজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওরশ, র‌্যালীসহ নানা ধরণের সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয় তাদের বাদ্যযন্ত্র। এ ধরণের প্রতিটি দিনব্যাপি অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বাবদ জনপ্রতি পান এক হাজার টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্যক্তি মালিকাধীন মাত্র ৫৯ শতাংশ জমিতে অবস্থিত এ গ্রামটিতে গড়ে উঠেছে মাত্র একটি সেমিপাকা ঘর। বাকি সব ঘরগুলোই তোলা হয়েছে টিনের ঝুঁপড়ি দিয়ে। ৫৯ শতাংশ জমির গ্রামটিতে এতগুলো পরিবার বসবাসের ফলে তাদের এক একটি পরিবার এক বা আধা শতাংশ জমির মালিক। আবার অনেকেই আছেন ভূমিহীন। নেই তাদের কোন আবাদী জমি। এদের বেশিরভাগ ঘরেই নেই শোয়ার মত খাট বা চৌকি। সরকারিভাবে স্যানেটারী পায়খানা তৈরির রিং পাট আর স্লাব বসানো হলেও সেগুলোতে টিনের বেড়া দেয়ার সাধ্যও হয়নি হতদরিদ্র এই পরিবারগুলোর। এ কারণে পলিথিন বা সিমেন্টের কাগজ দিয়ে ঘিরেই কোন রকমে চলছে এর ব্যবহার। এর মধ্যেই চলছে গ্রামটিতে বসবাসরত শিশুদের খেলাধুলা, বৃদ্ধসহ পরিবারের সকল বয়সী নারী পুরুষের চলাচল। একই সাথে পরিবার পরিকল্পনা প্রদ্ধতি মেনে চলার চরম অসচেতনতায় গ্রামটির প্রতিটি পরিবারেই বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য সংখ্যা। এছাড়াও ওই গ্রামের মরহুম বরকত আলী নার্গাচীর স্ত্রী খুশিরন (৫৫) প্রধানমন্ত্রীর দেয়া একটি ঘর পেলেও তারও নেই স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানার ব্যবস্থা।

বায়ানপাড়া গ্রামের চার সন্তানের জনক ও বয়োজ্যেষ্ঠ করনেট বাঁশি বাদক দরাজ আলী নার্গাচী (৭৮) জানান, আমাগো জাতিগত ব্যবসা এই ঢোল ব্যবসা। পূর্বপুরুষ থেকে আমাগো এই ব্যবসা চৈইলা আসছে। করোনার কারনে লকডাইনে ব্যবসা বাণিজ্য নাই, তাই খুব অভাবে আছি। বছরের ছয় মাস চলে আমাগো এই ব্যবসা। যখন কাম থাকেনা তহন আমরা রিক্সা বাই, কেউ কেউ আবার হাটে বাজারে ইঁদুর, তেলাপোকা, পিঁপড়া মারার ওষুধ বিক্রি কৈইরা চলে। সেই কাজও এখন বন্ধ তাই এক পেট খেয়ে কোন রকমে বাইচা আছি। সরকার আমাগো দিকে তাকায় না।

চার সন্তানের জনক ও বাঁশি বাদক জোয়াদ আলী নার্গাচী (৪৮), দুই সন্তানের জনক ও বাঁশি বাদক শফিকুল ইসলাম নার্গাচী (৩৪) ও তিন সন্তানের জনক আহাম্মদ আলী ভান্ডারী নার্গাচী (৫০) বলেন, অন্য কোন কাম জানা নাই বৈইলা কোন রকমে এ পেশা দিয়াই বাইচা আছি। আমরা নাটক, যাত্রা, বাউলগান, হিন্দু বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পূঁজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওরশ, র‌্যালীসহ বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থাকেন তারা। তবে দেশে এখন করোনা আইসা আমাগো কাজ কৈইমা গেছে। এ কাম কৈইরা এখন কোন রকমে চলতাছে আমাগো পেট। বাংলার ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা।

চার সন্তানের জনক হযরত আলী নার্গাচী (৫৫) বলেন, আমাগো পূর্বপুরুষের ব্যবসা এই ব্যান্ডপার্টি। এ ব্যবসার উপরই আমাগো সংসার চলতাছে। এ ব্যবসা ছাড়া আমাগো কোন অর্থ সম্পদ নাই। বছরের ছয়মাস যখন কাম না থাকে পেটে ভাতে বেঁচে থাকার তাগিদে দিনমজুরের কাম করাসহ রিক্সা চালান বলেও জানায় সে। সেই কাজ ও এখন বন্ধ।

আপন ঢুলি নার্গাচী (২৮) বলেন, আমরা খুবই দরিদ্র এ কারণে ছালা দিয়া ঘিরা পায়খানা ব্যবহার করতাছি। সরকারিভাবে দেয়া পায়খানা আমরা গরীব বৈইলা পাইনা। অন্যজনাগো দিয়া দেয়। চেয়ারম্যান-মেম্বাররে জানাইয়া কোন কাম হয়নাই বলেও জানান তিনি। এখন পর্যন্ত কোন সরকারী সাহায্যে মেলেনি তাদের ভাগ্য।

ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, প্রায় তিন’শ বছর যাবৎ এ গ্রামে এই বায়ান সম্প্রদায়ের বসবাস। করোনার প্রভাবে এ ব্যবসায় প্রায় ধস নেমে গেছে। ব্যবসা খারাপ হওয়ায় এ পরিবারগুলোর অনেকেই এখন হাটে বাজারে মশা, মাছি ও ইঁদুরের ওষুধ বিক্রি কৈইরা পেট চালাইতাছে। এ গ্রামে বসবাসরত পরিবারগুলোর অধিকাংশেরই কারো আদা শতাংশ জমি, কারো এক পোয়া শতাংশ জমি, কারো তিন পোয়া শতাংশ জমি, কারো এক শতাংশ জমি রয়েছে। আবার অনেকেই আছেন একদম ভূমিহীন।

দিগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ (মামুন) বলেন, বায়ানপাড়ার অধিকাংশ পরিবারকে পায়খানা নির্মাণে রিং পাট ও স্লাব দিয়েছেন তারা। বেড়া তাদের দিয়ে নেয়ার কথা। এছাড়াও প্রতি বছরই বন্যায় ওই গ্রামটি তলিয়ে যেত বলে ইতিপূর্বে বাঁশের সাঁকো দিয়ে যাতায়াতের সুবিধা করে দিয়েছিল তারা। পরবর্তীতে মাটি ফেলে বায়ানপাড়ায় যাতায়াতের রাস্তাও করে দেয়া হয়েছিল। তবে বন্যায় ওই রাস্তাটির অনেকটাই ক্ষতি হয়েছে। এরপরও এলজিএসপির বরাদ্দ থেকে গ্রামটির রাস্তা রক্ষায় গাইডওয়াল নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। করোনা সংকট মোকাবেলায় এই সম্প্রদায়ের লোকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে তিনি জানান।


ফেসবুকে আমরা...

কপিরাইট © ২০২১ একতার কণ্ঠ এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।